১১:৪১ পি.এম
‘একদিকে সুন্দরবনের বেশির ভাগ জায়গায় মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়ে অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে সরকার। আবার বনদস্যুর ব্যাপক অত্যাচার, টাকা ছাড়া বনে পা দেওয়া যায় না।
মহাজন তো আছেই। পরিশ্রম করি ঠিকই কিন্তু টাকা ও সুখ দেখতে পাইনা। আড়তদার ও কোম্পানিদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মাছ ও টাকা নিয়ে নেন, প্রথমে মাছ, এরপর নগদ টাকা কেটে নেন। আইগা শুধুই কষ্টই থাকে।’ এভাবেই নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন খুলনার কয়রা উপজেলার জোড়শিং গ্রামের জেলে আবু মুসা।
আরও পড়ুন: ভাণ্ডারিয়ায় কচাঁ নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন দেড় ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ, প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার
শুধু আবু মুসাই নন, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭ লাখ পরিবারের জীবন ও জীবিকা এভাবেই কষ্টে কাটছে। সুন্দরবনের সংরক্ষিত অঞ্চল বৃদ্ধি পাওয়ায়, বনদস্যুর অত্যাচার, অসাধু জেলেরা বিষ দিয়ে আছ আহরণ, অসাধু বনকর্মকর্তাদের ঘুষ বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ায় গত এক দশকে মৎস্য আহরণ, মধু আহরণ, বনজ সম্পদ আহরণসহ নানা উপায়ে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় কমছে। হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করা সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবীদের সচ্ছল জীবনযাপন এখন কাটে অভাব অনটনে।
অভাব যেন নিত্য সঙ্গী। ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে বর্তমানে তাঁরা নানা সংকটে দিন পার করছেন।
১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটারেরই মালিকানা বাংলাদেশের। খুলনার সর্বদক্ষিণের সুন্দরবন ঘেরা সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলা কয়রা। উপজেলাটির মোট আয়তন সুন্দরবনসহ ১ হাজার ৭৭৫ দশমিক ৪১ বর্গকিলোমিটার এবং সুন্দরবন বাদে ২৬৩ দশমিক ১২ বর্গকিলোমিটার।
কয়রায় বসবাসরত ৭০ ভাগ মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবী। কয়রা ছাড়াও সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ তাদের জীবিকার জন্য পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এসব জনগণ বসবাস করে, যারা জীবিকার জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনের গভীরে প্রবেশ করেন। তবে গত এক দশকে এসব অঞ্চলের মানুষের আয় কমছে সুন্দরবন থেকে।
আরও পড়ুন: কালিয়াকৈরে মহাসড়ক জুড়ে অবৈধ দোকান ও অটো স্ট্যান্ড, শিক্ষার্থী ও গার্মেন্টস শ্রমিকরা জিম্মি
বন বিভাগ তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে ২০১৭ সালে ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৫২ শতাংশ করা হয়েছে। তাই সম্পদ আহরণ সংকীর্ণ হয়ে আসার পাশাপাশি আয় কমেছে সুন্দরবন নির্ভর জনগোষ্ঠীর। বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেছেন, নতুন কর্মসংস্থানের খোঁজে বাস্তুচ্যুতও হয়েছেন অনেকে। অনেকে অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শাস্তির শিকার হয়েছেন। বন থেকে মাছ, মধু কিংবা অন্য কোনো সম্পদ বৈধভাবে আহরণ করে আগে যেখানে সচ্ছলভাবে চলত প্রতিটি পরিবার, সেখানে এখন ঋণের বোঝা নিয়ে চলতে হয় তাদের।
সুন্দরবন ঘেঁষা এলাকার অধিকাংশ পুরুষেরা মৎস্য আহরণ, গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু আহরণে আর নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরায়। নারীরা কখনো পুরুষের নৌকায় সুন্দরবনে যান মাছ ধরতে। শিশুরা হাঁটাচলা শিখে বাইরে বের হওয়ার পর থেকেই প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে বনের কাজে। এত কষ্টের পরেও সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোর বনজীবীদের কষ্টের দিন শেষ হয় না। পরিবারের সবাই মিলে কঠিন সংগ্রাম করেও তিনবেলা ভাত জোটাতে না পেরে বনজীবীদের অনেকে আবার ফিরছে অন্য কাজে। কেউ এলাকায়, আবার কেউ দূরের শহরে। ঋণ বা দাদনের জালে অনেকটাই বন্দি হয়ে পড়েছেন উপকূলের এসকল জেলেরা। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার থাকে না। এ কারণে সংসার চালাতে কিংবা পরিবারের সদস্যদের মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দিতে জেলেরা হাত পাতছেন বিভিন্ন এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ী (কোম্পানি নাম ধারী) কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে। ঋণ নিয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করলেও পরবর্তী সময়ে যা আয় করছেন তা দিয়ে চালাচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি। আর অসাধু কোম্পানি ব্যবসায়ী এ সুযোগে করেন সদ্ব্যবহার সারা বছর তাদের আয়ের একটা পথ নেন তৈরি করে। ঋণ-দাদনের কিস্তির টাকা দিতে গিয়ে বাড়তি কোনো টাকা আর সঞ্চয় রাখতে পারছেন না।
সরেজমিনের কয়রা এলাকা ঘুরে, ওপারে সুন্দরবন, এপারে লোকালয়, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কম প্রশস্তের ছোট্ট নদী শাকবাড়িয়া। এ নদীর পারে সুন্দরবন লাগোয়া গ্রাম, মহেশ্বরীপুর, তেঁতুলতলার চর, মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, কয়রা ৪ নম্বর, ৫ নম্বর, ৬ নম্বর, পাথরখালী, মাটিভাঙ্গা, চৌকুনি, গিলাবাড়ি, হাতিয়ারডাঙ্গা, ভাগবা, কাটকাটা, গাববুনিয়া, শাকবাড়িয়া, হরিহরনগর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা, গোলখালী ঘুরে বনজীবীদের জীবন সংগ্রামের নানা তথ্য মেলে।
মঠবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা রমেন মন্ডল, তিনি প্রায় এক যুগ ধরে সুন্দরবনের ওপর ভর করে জীবনযাপন করছেন। তিনি দাবি করেন, ফরেস্টের ঘাটে ঘাটে টাকা দিলে গভীরে যাওয়া যায়। কিন্তু পাসের টাকা, অন্যান্য খরচের টাকা, বনদস্যুর টাকা, ঘুষের টাকা দিয়ে গভীরে গিয়ে যে মাছ পাওয়া যায় তা দিয়ে আসলেই কিছু হয় না। তাই এ বছর আর জঙ্গলে যাইনি। মহাজনের কাছে টাকা ধার করে সংসার চালাচ্ছি। জানি না এভাবে আর কতদিন চলতে পারব। আমাদের যদি একটু অন্য কোনো আয়ের ব্যবস্থা কেউ করে দিত।’
আরও পড়ুন: নেত্রকোণায় গুলি করে সাংবাদিক হত্যা, ঢাকা মেট্রোপলিটন প্রেস ক্লাব র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ
৬নং গ্রামের জেলে রজব আলি বলেন, ‘সরকারই পারে সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে। নতুবা আমাদের অভাব কোনো দিন শেষ হবে না।’
৫নং কয়রা ও ৬নং কয়রা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অনেক জেলে ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা দুপুরের খাওয়া শেষে ঘুমাচ্ছেন। আবার অনেকে ছোট মাছ ধরার জাল বুনছেন। কেউ কেউ নদীতে খাওয়ার মাছ ধরতে গেছেন।
সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য জাল বুনে প্রস্তুতি সারছিলেন এই গ্রামের ৬নং কয়রা গ্রামের জেলে আবু তালেব সরদার। তিনি বলেন, ‘গত বছরও মাছ ধরতে গিয়ে আমার ১০ হাজার টাকার ওপর লোকসান হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে বনে যাওয়া নিষেধ থাকে। যে কদিন যাওয়া যায়, গিয়েই-বা কী করব? দাদন ব্যবসা ও মহাজনের কবলে পড়ে এ গ্রামের জেলেরা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। আর প্রতিদিন মাছ নিয়ে আড়তে না গেলে আড়তদারদের লোকজন বাড়িতে এসে জেলেদের অনেক বড় কথা ও অনেক সময় মারধরও করেন।’
সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মানুষদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের (আইসিডি) প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগে বনে প্রবেশ না করেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক এসব মানুষকে নতুন আয়ের পথ খুলে দেওয়া সম্ভব, যা অবদান রাখতে পারে সুন্দরবনের অর্থনীতিতেও। সুন্দরবনকেন্দ্রিক অনেক বিকল্প ব্যবস্থা আছে।’
আরও পড়ুন: নেত্রকোণায় গুলি করে সাংবাদিক হত্যা, বাংলাদেশ অনলাইন সংবাদপত্র ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহম্মেদ বলেন, ‘সুন্দরবন যেমন আমাদের রক্ষা করা প্রয়োজন তেমনি এত গুলো মানুষের জিবীকি নির্বাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ‘আমরা চেষ্টা করছি বনজীবীদের বিকল্প আয়ের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করতে। বেশ কয়েকটি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। বনজীবীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের জন্য যোগ্য করে তোলা হবে।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
