০৫:২৩ পি.এম
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার একদল মুসলিম নারীরা অভিযোগ করেছেন যে, তারা একটি আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের সুবিধা চাইতে গিয়ে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক নীললয়ন শেখর দানার (নীলাদ্রি শেখর দানা) কাছে অপমানিত হয়েছেন। ‘অন্নপূর্ণা পরিকল্পনা’ প্রকল্পের আওতায় দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের নারীদের জন্য সাহায্য পেতে তারা ওই বিধায়কের কাছে গিয়েছিলেন।
প্রথমবারের মতো এই অভিযোগের কথা সামনে আনা হয়েছে 'দ্য ওয়ার'-এর একটি প্রতিবেদনে। বিজেপি বিধায়ক অশালীন মন্তব্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দ্য ওয়ার-এর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে বাঁকুড়া পৌরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের খেতারডাঙা এলাকার প্রায় ৩০ জন নারী ভৈরবস্থানের কাছে বিধায়কের কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করতে যান।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারের অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুতে এবি পার্টির শোক ও দায়ীদের শাস্তির দাবি
নারীদের অভিযোগ, বিধায়ক তাঁদের দেখামাত্রই ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। প্রকল্পের আওতায় প্রাপ্ত টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, প্রথমে হিন্দু নারীদের অনুদান দেওয়া হবে এবং মুসলিম নারীদের বিষয়টি পরে বিবেচনা করা হবে।
অভিযোগকারী শরিফী বিবি জানান, বিধায়ক তাঁদের বলেছিলেন যে তিনি মুসলিমদের ভোটে নির্বাচিত হননি, তাই তাঁদের বিষয়টি পরে দেখা হবে। এছাড়া উপস্থিত নারীদের দাবি, বিধায়কের সঙ্গে থাকা অনুগামীরা তাঁদের দিকে কুরুচিকর অঙ্গভঙ্গি করেন এবং সাহায্য পাওয়ার শর্ত হিসেবে পাল্টা ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
ঘটনার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নূরজাহান বিবি বলেন, “আমরা সাহায্যের আশায় এসেছিলাম, কিন্তু তার বদলে আমাদের অপমানিত হতে হলো।”
নারীদের মূল অভিযোগ হলো, তারা অন্নপূর্ণা প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতি মাসে তিন হাজার (৩,০০০) টাকার আর্থিক সহায়তা পাননি। বিজেপি সরকার গঠন করার পর থেকে তারা একটি কিস্তির টাকাও পাননি বলে দ্য ওয়ার-কে জানিয়েছেন অনেক ভুক্তভোগী। প্রকল্পের টাকা পরিশোধে ধারাবাহিক বিলম্বের কারণে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজা সামনে রেখে পাইকগাছায় পুলিশের অভিযান, ৯ জন আটক
নারীরা জানান, প্রশাসনিক দিক থেকেও তাঁদের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরিয়ে মারা হচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে তাঁরা অনলাইন ও অফলাইনে আবেদনের কাগজপত্র নিয়ে বাঁকুড়ার মহকুমা শাসকের (এসডিও) কাছে যান। সেখান থেকে তাঁদের ২ থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত আয়োজিত 'সেবা সেতু অভিযান' নামক সরকারি গণসংযোগ শিবিরে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ২ অক্টোবর প্রথম দিনেই নারীরা যাবতীয় নথিপত্র নিয়ে গোধূলি লজের শিবিরে উপস্থিত হলে, তাঁদের আবার ফেরত পাঠিয়ে সরাসরি স্থানীয় বিধায়কের কাছে যেতে বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেতারডাঙা অঞ্চলের অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলিম সম্প্রদায়ের এবং তাঁদের জীবিকার মূল উৎস দৈনিক মজুরি। বাঁকুড়া সম্মিলিত কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন প্রধান অধ্যাপক প্রতীপ মুখোপাধ্যায় জানান, ওই এলাকার বাসিন্দাদের বড় একটা অংশ দিনমজুর। রেলের মালগুদাম কিংবা বাঁকুড়ার স্থানীয় বাজারে তাঁদের অনিয়মিত কাজ মেলে, যার ফলে পরিবার চালাতে তাদের চরম অনটন সহ্য করতে হয়।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর থেকে নারীরা গভীরভাবে মানসিক আঘাতে দিন কাটাচ্ছেন। সাবেনা মণ্ডল ও রেশমা বিবি জানান, এ ঘটনা জানার পর তাঁদের পাড়ার অনেকেই বাড়ি ফিরে আর দানাপানি মুখে তুলতে পারেননি। পরবর্তীতে সাবেনা মণ্ডলের বাড়িতে জরীনা বিবি, হাসিনা বিবি, সাহেদুন বিবি, আয়েশা বিবি ও ফুলসুরা বিবিসহ অন্যান্য নারীরা একত্র হয়ে তাঁদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বৈঠক করেন।
প্রাপ্য অনুদান না পাওয়ার কারণ জানতে এবং ধর্মীয় পরিচয়ের অজুহাতে কোনো বিধায়ক তাঁদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন কি না— সে বিষয়ে স্পষ্ট জবাব চাইতে আগামী ৬ অক্টোবর তাঁরা সবাই বাঁকুড়ার মহকুমা শাসকের দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরের মেয়ের প্রেমে পাল্টে গেলেন চীনা যুবক, বিয়ে করতে চান কালেমা পড়ে
অন্যদিকে, দ্য ওয়ার-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বিধায়ক নীললয়ন শেখর দানা স্বীকার করেন যে তিনি ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়েছিলেন। তবে তিনি কোনো নারীকে অপমান করার অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে দাবি করেন, তিনি কেবল তাঁদের বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
একইসঙ্গে তিনি যোগ করেন, ওই সময় তাঁর কাছে অনেক লোক উপস্থিত ছিল এবং তাঁদের ব্যক্তিক্রমী কোনো মন্তব্যের দায়ভার তাঁর নয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন