০৫:০৪ পি.এম
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সরকারের কাছে বাংলাদেশের, দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবন এবং স্বাস্থ্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অবহেলা, গাফিলতি কিংবা দায়িত্বহীনতার জন্য একটিও স্থান থাকতে পারে না। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর একটি ঘটনা ঘটার প্রমাণ পাওয়ার পর, এটি মানবিক ভুল এবং চরম অবহেলার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করেছে এবং ঘটনার জন্য দোষীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা উপস্থাপন করেন। বাজেট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ঘটানো মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত ছয় নবজাতকের পরিবারগুলোর প্রতি। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব শুধুমাত্র সমবেদনা জানাতে শেষ হয় না; মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াটাও সরকারের কর্তব্য।
মন্ত্রী যোগ করেন, সবার আগে বাংলাদেশ। আমাদের দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য এবং মূল্যবোধের দিকে নজর দিতে হবে। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনা সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সময় নবজাতকদের রাখা কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ ছিল, অথচ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কক্ষটি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল, জানালা না থাকায় সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রবাহের ব্যবস্থা ছিল না। এ কারণেই শিশুরা কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে শ্বাসরোধজনিত অবস্থায় মারা গেছে।
আরও পড়ুন: ফুটপাত পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ, ছাত্রলীগ নেতা তানভীর গ্রেফতার
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ১৬-১৭ জন মা আতঙ্কিত হয়ে সাহায্যের জন্য ছুটাছুটি করেছিলেন, কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের দ্রুত সেখানে উপস্থিতি দেখা যায়নি। পরে তিনি নিজেই সেখানে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং তারা স্বীকার করেন যে, অক্সিজেনের অভাব এবং অবহেলার কারণে শিশুদের মৃত্যু ঘটেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, 'আমরা কি বসে থাকব? আমরা এর পরে দেশের সব হাসপাতালকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চাই। মানুষের জীবন নিয়ে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।' তিনি উল্লেখ করেন, অনেকে অতীতের হাসপাতাল দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন। কিন্তু তিনি বলেন, ইউনাইটেড হাসপাতাল কিংবা বার্ন ইউনিটের দুর্ঘটনা বিদ্যুৎ শিখার অগ্নিকাণ্ডজনিত, অন্যদিকে আদ্-দ্বীনের ঘটনা সম্পূর্ণ মানবিক অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফলস্বরূপ।
মন্ত্রী আদ্-দ্বীন হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, হাসপাতাল ভবনের ভেতরেই একটি বেকারি পরিচালিত হচ্ছিল। সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ ছিল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অগ্নি-নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি ছিল। এভাবে আগুন লাগলে কোথাও রোগী, স্বজন বা স্বাস্থ্যকর্মীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো না। তিনি অভিযোগ করেন যে, ঘটনার পর হাসপাতালের মালিক ঘটনাস্থলে যাননি। বরং প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিবর্তন এনে নিজের স্ত্রীকে প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। নিহত শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা জানানো হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বলেন, 'আমরা মাথা কাটতে বলিনি, আমরা শুধু লাইসেন্স স্থগিত করেছি। তদন্ত চলছে, সরকার সবকিছু নজর রাখবে। তবে এ ঘটনাকে রাজনৈতিক বিষয় বানানো উচিত নয়।' বাজেট প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে মানুষের কল্যাণের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা সেবা আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে একাধিক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে সাত, হাসপাতালে ভর্তি ১,৩৭৩ জন
মন্ত্রী জানান, বাজেটে ‘হেলথ কার্ড’ চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা হবে। এছাড়াও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ওষুধ উৎপাদনের জন্য কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে বিশেষ করে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই)-এর ওপর। ক্যান্সার চিকিৎসা এবং কিডনি ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন ব্যয়বহুল চিকিৎসা-উপকরণের ওপর কর হ্রাস করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্স’ বা চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
মন্ত্রী বলেন, এই বাজেট শুধুমাত্র সংখ্যার বাজেট নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুণগত বাজেট। তিনি আরও বলেন, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে সরকার সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে। ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি শিশুকে একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা সহায়ক হবে।
সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, জনগণের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
আরও পড়ুন: গর্ভের সন্তান বিক্রি করতে চাওয়া আঁখির পাশে প্রধানমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন