০৪:০৭ পি.এম
নরওয়ের সামরিক বাহিনীর স্পর্শকাতর তথ্য ধারণের ঘটনা চীনে তৈরি স্মার্ট গাড়ির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গাড়ির ক্যামেরায় সেনাসদস্যদের চলাচল, তাদের ওঠানামা, এবং সামরিক স্থাপনায় প্রবেশের গেট ও দরজার কোডও ধরা পড়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব তথ্য অন্য কোনো পক্ষের কাছে, বিশেষ করে চীনে, পাঠানো হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নরওয়ের সংবাদপত্র দাগেনস নেরিংসলিভ–এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর অসলো বিমানবন্দরে সামরিক বাহিনীর একটি নিরাপত্তা মহড়া চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। গাড়িতে অপেক্ষা করার সময় সেনাসদস্যেরা এর পর্দায় ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও দেখতে পান।
নরওয়ের হোম গার্ডের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল পের গুনার গ্রোসবার্গহাউগেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, হোম গার্ডের সদস্যরা গাড়ির সেন্সরে ধারণ করা ভিডিও পেয়েছিলেন। তবে তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি যে এসব তথ্য তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল কি না।
আরও পড়ুন: শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য ২০০ ট্রলি প্রদান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়িগুলো ভাড়া নেওয়া হয়েছিল এবং এর মধ্যে অন্তত দুটি ছিল চীনা গাড়ি নির্মাতা চ্যাংআনের তৈরি ডিপাল ব্র্যান্ডের গাড়ি। সেনাবাহিনীকে গাড়িগুলো সরবরাহ করেছিল হার্টজ নরওয়ে, যার পরোক্ষ মালিকানা চীনা গাড়ি নির্মাতা গিলির হাতে রয়েছে।
ক্যামেরায় স্পর্শকাতর তথ্য ধারণের বিষয়টি জানার পরও বিকল্প গাড়ি না থাকায় মহড়া শেষ হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ব্যবহার করে সামরিক বাহিনী। পরে সেনাসদস্যেরা ভিডিওগুলো মুছে দেন।
নরওয়ের সামরিক বাহিনী মনে করছে, চীনে তৈরি সব গাড়ি নিষিদ্ধ করলে নিরাপত্তার সম্ভাব্য সুফলের তুলনায় এর প্রভাব বেশি হতে পারে। তাই তারা সব চীনা গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞার বদলে নির্দিষ্ট স্থাপনার নিরাপত্তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে। প্রয়োজনে ক্যামেরা ও সেন্সরযুক্ত গাড়ি—সেগুলো যে দেশেই তৈরি হোক—কিছু স্থানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
হার্টজ নরওয়ের বিপণন ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক হালভার্ড নেরবোভিক জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি নরওয়ে ও ইউরোপের আইন মেনে চলে। তিনি জানান, আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য গাড়ি নির্মাতা, মালিক বা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে ভাগ করা হয় না। তবে ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও অন্য কোথাও পাঠানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। এ বিষয়ে চ্যাংআন গ্রুপ প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি, তীব্র বিক্ষোভ ও সহিংসতার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
‘চলন্ত কম্পিউটার’ হয়ে উঠছে গাড়ি :
নরওয়ের এই ঘটনা আধুনিক গাড়ির তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ক্যামেরা, সেন্সর ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত প্রযুক্তির কারণে গাড়ি এখন শুধুমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি বিপুল তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম।
গত বছর অসলো অঞ্চলের গণপরিবহন কর্তৃপক্ষ রুটারের জন্য চালানো এক পরীক্ষায় দেখা যায়, চীনা প্রতিষ্ঠান ইউটংয়ের তৈরি বৈদ্যুতিক বাস দূর থেকে সফটওয়্যার হালনাগাদের মাধ্যমে তাত্ত্বিকভাবে অচল করে দেওয়া সম্ভব। জরুরি পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে সরিয়ে নিতে এসব বাস ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে নরওয়ের। রুটার জানিয়েছে, এরপর থেকে দূর থেকে আসা সংকেত পর্যবেক্ষণ এবং সফটওয়্যার হালনাগাদ বিলম্বিত করার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
গাড়ির বাইরেও স্মার্টঘড়ি ও স্ট্রাভার মতো শরীরচর্চার অ্যাপ থেকে সামরিক বাহিনীর স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশিত হওয়ার নজির রয়েছে। ২০১৮ সালে স্ট্রাভায় প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে আফগানিস্তান ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে সামরিক স্থাপনা এবং সেনাদের চলাচলের পথ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। চলতি বছরের মার্চে ফরাসি সংবাদপত্র লে মোঁদ স্ট্রাভা ব্যবহারকারী এক নাবিকের তথ্যের ভিত্তিতে ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলে ফ্রান্সের বিমানবাহী রণতরি শার্ল দ্য গলকে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছিল।
আরও পড়ুন: উটের প্রস্রাবেই সারবে ক্যানসার? সৌদি ভাইরাল দাবির সত্যতা জানাল
নরওয়ের জাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা আন্দ্রেয়াস স্কজোল্ড-লোরাঞ্জ আধুনিক গাড়িকে ‘চলন্ত কম্পিউটার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, এসব গাড়ি কী তথ্য সংগ্রহ করছে, সেই তথ্য কোথায় পাঠানো হচ্ছে এবং কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই।
তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকির পাশাপাশি কোনো একটি দেশের পণ্য বা সেবার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিষয়েও সতর্ক করেছে নরওয়ের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতা করে না—এমন কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন