০৬:০৩ পি.এম
হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের পর এবার কি কাস্পিয়ান সাগর নতুন সংঘাতের মঞ্চ হতে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন উঠেছে ইউক্রেনের হামলায় একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায়।
হামলায় ইরান জানিয়েছে, একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। এর জেরে ইউক্রেনের কূটনীতিকদের তলব করে কিয়েভের বিরুদ্ধে ‘শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছে তেহরান। খবরটি এসেছে আল-জাজিরার মাধ্যমে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, শনিবারের ওই হামলার পর তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। ইরানের দাবি, এ হামলা জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন হয়েছে এবং এটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন, তাই ভাঙা রাস্তায় পড়ছে নতুন পিচ!
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কঠোর প্রতিক্রিয়া এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তেহরান আবারও দাবি করেছে, তারা সরাসরি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেছেন, ইউরোপীয় দূরপাল্লার হামলায় ইরানের সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজ এবং একটি রুশ যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। যদিও তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজটির নাম উল্লেখ করেননি। একই সঙ্গে জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে, রাশিয়া উপসাগরীয় অঞ্চল ও সেখানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির স্যাটেলাইট তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে, যা পরবর্তী হামলার প্রস্তুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটির ওপর রুশ নজরদারির তথ্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন টানা ১৩ রাতের মার্কিন হামলার পর আপাতত সংঘাত কিছুটা থেমে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এখনও প্রশমিত হয়নি।
দক্ষিণে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথিদের হামলার কারণে ইতোমধ্যেই ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য চাপের মুখে রয়েছে।
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা
এই পরিস্থিতিতে কাস্পিয়ান সাগরেও যদি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়, তবে তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ একেবারেই সংকুচিত হতে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহের পর তেহরান ও কিয়েভের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া ইরানি নকশার এসব ড্রোন ব্যবহার করে দেশজুড়ে হাজারো হামলা চালিয়েছে এবং এ পর্যন্ত ৪৪ হাজারের বেশি ইরানি নকশার ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তাও দিচ্ছে কিয়েভ।
তবে, হামলার জবাবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না সে বিষয়ে। ইরান এখনও কোনো ঘোষণা দেয়নি। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ইউক্রেন ইরানের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থার পাল্লার মধ্যে রয়েছে।
তবে, কাতার, মিসর, পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে উভয় পক্ষের কাছে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: মুদ্রাস্ফীতির চোরাবালিতে ডুবছে রিপাবলিকানরা?
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইরানে চলমান বিমান হামলার পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে তিনি নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগকে সময় দিতে সেটি অনুমোদন দেননি।
উল্লেখ্য যে, কাস্পিয়ান সাগরে হামলার মাধ্যমে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। কারণ, এই সামুদ্রিক পথও ঝুঁকির মুখে পড়লে, তেহরানের জ্বালানি রপ্তানি ও সামরিক সরবরাহে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা মাইকেল মুলরয়ের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকায় ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিকল্পও ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। তার ভাষ্য, আলোচনায় কোনো অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এবং ইরানও হরমুজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন