০৪:৩৩ পি.এম
ক্লাস শুরু হতে তখনো কিছু সময় বাকি। বিদ্যালয়ের এক কোণে রাখা বইয়ের আলমারি। তার সামনে জড়ো হয়েছে উম্মে হাবিবা, সাদিয়া, আহনাফ তাহমিদ, নওরিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
আলমারির মধ্যে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বই। সেখান থেকে কেউ বেছে নিচ্ছে রূপকথার গল্প, কেউ খুঁজছে বিজ্ঞানবিষয়ক বই। কেউ পছন্দের বইটি বাড়িতে নিয়ে যেতে নিজের নাম লিখছে রেজিস্ট্রার খাতায়। পছন্দের বইটি হাতে পেয়ে শিশুদের চোখেমুখে ফুটে উঠছে আনন্দ। বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার শিশুদের এই আনন্দ এনে দিয়েছে।
শহর থেকে দূরে
আরও পড়ুন: কক্সবাজারের আগুনে নিহত নাবিলার স্মরণে জবিতে শোক ও দোয়া মাহফিল
কুমিল্লা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লালমাই অবস্থিত। মেঠোপথ, সবুজ প্রকৃতি আর হিমেল হাওয়ায় ঘেরা এ উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগটির নাম বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার।
উপজেলার ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৭ হাজার ৪৭৬ শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছে দিয়েছে এই পাঠাগার। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিশুদের আরেকটি জগৎ চিনতে, কল্পনাশক্তি বাড়াতে এবং বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রথমে উদ্যোগটি গ্রহণ করেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাইফ মিঠু।
প্রবাসে থেকেও দেশের শিশুদের জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়াতে কাজ করছেন মিঠু। নিজের এবং বন্ধুদের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার। তার সঙ্গে কাজ করছেন আরও ১০ স্বেচ্ছাসেবী। যুক্তরাজ্যে বসেই পাঠাগারের খোঁজখবর রাখেন তিনি। এ জন্য ৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ১০ স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।
গ্রুপের মাধ্যমে পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালনা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও পরামর্শ পেয়ে থাকেন সংশ্লিষ্ট সবাই। দেশে থাকা স্বেচ্ছাসেবীরা সেসব নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোতে পাঠাগারের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন।
আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ৭৪ শতাংশে বিষণ্নতার লক্ষণ: গবেষণা
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জামুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: কালের কণ্ঠ
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতি সপ্তাহেই তারা পাঠাগার থেকে বই নিয়ে যায়। পাঠাগারে বিভিন্ন মজার বই রয়েছে। পড়া শেষ হলে বই রেখে নতুন আরেকটি বই নিয়ে যায়। এমন সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বিদ্যা বিকাশকে ধন্যবাদও জানায় শিশুরা।
যেভাবে দাঁড়াল বিদ্যা বিকাশ
২০২৪ সালের মার্চ মাস। সাইফ মিঠুর মেয়ে আরিয়া তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তখন। ইংল্যান্ডের কেন্ট (মেডওয়ে) অঞ্চলের গিলিংহামে অবস্থিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া আরিয়া প্রতি সপ্তাহে স্কুল থেকে বই নিয়ে আসত বাসায়। গল্প, রূপকথা, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও বিভিন্ন মনীষীর জীবনীসহ নানা বিষয়ের বই। পড়া শেষে ফেরত দেওয়ার সময় স্কুলের দেওয়া ‘রিডিং রেকর্ডে’ অভিভাবকের স্বাক্ষর নিতে হতো। সেখানে স্বাক্ষর করতেন সাইফ মিঠু ও তার স্ত্রী।
আরও পড়ুন: যবিপ্রবিতে তারিকুল ইসলামের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
মিঠুর ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বই পড়ার এই অভ্যাস দেখে প্রশ্ন ওঠে তার মনে, বিশ্বের অগ্রগামী একটি শহরের বিদ্যালয়ের শিশুদের মতো তার নিজের দেশের গ্রামের শিশুরা কী বই পড়ার এমন সুযোগ পায়? তাদের হাতেও কী প্রতি সপ্তাহে নতুন বই পৌঁছায়? ভাবনাগুলো আচ্ছন্ন করে রাখে তাকে। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন মিঠু। শুরু হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের হাতে বই পৌঁছে দিতে বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের যাত্রা।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার যুক্তিখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: কালের কণ্ঠ
মিঠু জানান, প্রথমে লালমাই উপজেলার ১৫টি বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটিতে ১৫০টি করে বই দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের যাত্রা। পরে আরো ৫২টি বিদ্যালয়ে ১০০টি করে বই দেন তিনি। সব মিলিয়ে ৬৭টি বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হয় সাত হাজার ৪৫০টি বই।
পেছনে ১০ স্বেচ্ছাসেবী
আরও পড়ুন: শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও মানবিক হতে হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার
বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশে থাকা ১০ জন স্বেচ্ছাসেবী। মাঠপর্যায়ে তারা বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ, পাঠাগার গড়ে তোলার প্রস্তুতি, নতুন বই পৌঁছে দেওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত, সেরা পাঠক নির্বাচন, পুরস্কার বিতরণ, পাঠাগার উদ্বোধনসহ নানা কাজ করেন তারা।
এসব কাজে স্বেচ্ছাসেবী ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক এবং শিক্ষকরা সহযোগিতা করেন।
একটি উদ্যোগ থেকে বড় স্বপ্ন
ছোট পরিসরে শুরু হওয়া বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের কার্যক্রম এখন অনেক বিস্তৃত; কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না প্রতিষ্ঠাতা সাইফ মিঠু। তার পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা এবং বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাঠাগার গড়া।
আরও পড়ুন: কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে ৪৩ ধাপ এগিয়ে যবিপ্রবি ৬৪৪তম অবস্থানে
উপজেলার বাগমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শুরু থেকেই পাঠাগারের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. আহসান হাবীব। বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৩৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে বই বিতরণ, বই বিতরণ রেজিস্টার সংরক্ষণসহ পাঠাগারের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি নিজেই। শিক্ষার্থীদের বই পড়তে নানাভাবে উৎসাহিত করেন তিনি।
আহসান হাবীবের ভাষ্য, ‘আমার খুবই ভালো লাগে, যখন দেখি শিক্ষার্থী সিরিয়ালে রেজিস্ট্রারে নাম তুলে বই নিয়ে যায়। মোবাইল ফোনের এই যুগেও শিক্ষার্থীরা পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়ে- এটি সত্যি প্রশংসনীয়।’
তিনি বলেন, ‘এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও নানা বিষয়ে জ্ঞান বেশি। কারণ তারা এখন নিয়মিত বই পড়ে। এটি তাদের এখন পাঠ্যভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’
বিদ্যাবিকাশ পাঠাগারের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বয়কের করছেন কাজী ইয়াকুব আলী নিমেল। প্রান্তিক শিশুদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে বিদ্যাবিকাশের হয়ে কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ গত ১ নভেম্বর তাকে ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ যুব সংগঠক সম্মাননা’ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য মেলার আয়োজনের ঘোষণা প্রধান তথ্য কমিশনারের
কালের কণ্ঠকে নিমেল বলেন, বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের কার্যক্রম শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, পর্যায়ক্রমে উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
নিমেল জানান, বই পড়ার প্রতি শিশুদের আগ্রহ ধরে রাখতে প্রতিবছর সেরা পাঠক সমাবেশ করা হয়। এতে অংশ নেয় পাঠাগারের বই পড়া শিক্ষার্থীরা। পাঠ্যাভ্যাস, আগ্রহ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্বাচিত সেরা পাঠকদের দেওয়া হয় পুরস্কার। এর মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে।
উদ্যোক্তার ভাষ্য
বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাইফ মিঠু কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পরই কাজ শেষ হয়নি। পাঠাগার পরিচালনার জন্য ১০ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবীরা বইয়ের তালিকা সংরক্ষণ, নতুন বইয়ের তালিকা প্রস্তুত, স্কুলে স্কুলে বিতরণ, রেজিস্ট্রার খাতায় বিলি, সেরা পাঠক নির্বাচনসহ নানা কাজ করেন। এ ছাড়া এ কাজে এখন এলাকার শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিও যুক্ত।
লন্ডনের হাই সিকিউরিটি কারাগার এইচএমপি বেলমার্শ-এর খাদ্য বিভাগে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত সাইফ মিঠু আরো বলেন, পরিবার নিয়ে আমি যুক্তরাজ্যে থাকি। এখানকার একটি স্কুলে পড়ে আমার মেয়ে আরিয়া। বই পড়ার প্রতি তার আগ্রহ থেকে নিজের দেশের গ্রামের স্কুলগুলোতে পাঠাগার গড়ে তোলার চিন্তা মাথায় আসে।
মিঠু বলেন, ২০২৪ সালে প্রথমে আমরা সীমিত আকারে শুরু করি। দুই বছরের মাথায় ২০২৬ সালে এসে আমরা ৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাগার গড়ে তুলতে পেরেছি। এই কাজে সহযোগিতায় আমার অনেক বন্ধু, পরিচিতজন ও শুভানুধ্যায়ীও এগিয়ে এসেছেন।
মিঠু জানান, পাঠাগারের জন্য সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী, দর্শন, ভ্রমণ, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও সংস্কৃতি- বিভিন্ন বিষয়ের বৈচিত্রময় ও রুচিশীল বইয়ের তালিকা প্রস্তুত ও সংগ্রহ করার কাজ চলছে এখন। প্রথমে এত বই কেনার জন্য অর্থ কোথায় পাবো- তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম।
মিঠুর ভাষ্য, শুরুতে আমার কাছে এত বই কেনার জন্য তহবিল ছিল না। পরে সিদ্ধান্ত আমার পড়া ও ব্যায়ামের ঘরটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস এয়ারবিএনবিতে অতিথিদের জন্য ভাড়া দিলাম। পরে ভাড়ার সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের জন্য বই কেনা শুরু করি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন