১১:১০ পি.এম
১৬ জুন, ২০২৬, লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার পরদিন, নন্দিনী রায় (৭) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি ও মাটিচাপা দেওয়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে।
উত্তেজিত জনতার হামলায় জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান, পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে ডিসি, পুলিশের সুপার ও সাংবাদিকের গাড়িসহ অন্তত ১০টি যানবাহন।
এদিকে, নিখোঁজের ঘটনায় রাতেই থানায় সাধারণ ডায়েরি না নিয়ে পরিবারকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিক ক্লোজড করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র (১৮) ও রঞ্জিত কুমার রায় (৩০) কে আটক করেছে পুলিশ।
আরও পড়ুন: ধুনটে পাঁচ কোটি টাকার সড়ক কাজ বন্ধ, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
নিহত নন্দিনী রায় ফলিমারী গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। সোমবার দুপুর থেকে সে নিখোঁজ ছিল।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুরের দিকে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায় শিশু নন্দিনী। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে তার সন্ধান না পেয়ে, সে রাতে আদিতমারী থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করতে যান। কিন্তু থানার ওসি নাজমুল হক তা গ্রহণ না করে, পরিবারকেই খোঁজাখুঁজি করার পরামর্শ দিয়ে ফিরিয়ে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নতুন নরম মাটি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে সেখানে মাটি খুঁড়ে নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে, ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
নিখোঁজের রাতেই জিডি না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি জানার পর জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কর্তব্যরত অবস্থায় অবহেলা ও গাফিলতির কারণে আদিতমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে থানার দায়িত্ব থেকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন: বুকব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী
নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় আগুন জ্বলে ওঠে। উত্তেজিত জনতা প্রতিবেশী রঞ্জিত চন্দ্রের ছেলে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে বাড়িটির কয়েকটি ঘর এবং মালামাল পুড়ে যায়।
দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান, পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে। এসময় উত্তেজিত জনতা আচমকা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
ঘণ্টাব্যাপী চলা দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান, বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকসহ অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে উত্তেজিত জনতা পুলিশ ও সাংবাদিকদের গাড়িসহ অন্তত ১০টি যানবাহন ভাঙচুর করে লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
পুলিশ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুইজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে, তিনি হলেন প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র (২৩) ও রঞ্জিত কুমার রায় (৩০)।
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় পুলিশের অভিযানে চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার, ৪ গ্রেফতার
বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও বিজিবি সদস্য মোতায়েনের মাধ্যমে বর্তমানে ফলিমারী গ্রামের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও পুরো এলাকায় চরম থমথমে অবস্থা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেক বাড়িঘর পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে গিয়ে সরকারি কাজে বাধা এবং পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করার অভিযোগে পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করে কাজ করেছে। পুলিশের ওপর হামলা এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে অপরাধী যে-ই হোক, শিশু হত্যাকাণ্ড এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে কাজ করছে পুলিশ।
আরও পড়ুন: অক্টোবর মাসে সিলেটের সড়কে প্রাণ গেল ২৭ জনের
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন