১১:৫৫ এম
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার স্ত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিসৌধ এলাকায় দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
উদ্যানের উন্নয়নে নারী, পুরুষ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একাধিক পাবলিক টয়লেট ব্লক নির্মাণের কাজ চলছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য সেখানে গভীর নলকূপ এবং পাইপলাইন স্থাপন করা হচ্ছে। ক্রিসেন্ট লেকের অকেজো ফোয়ারা নতুন রূপ পাচ্ছে। পুকুরপাড়ে নতুন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। লেকের গাইড ওয়াল এবং ব্রিজের স্টিল ফ্রেমে রঙ করার কাজও চলছে। অডিটরিয়াম ও জিয়া স্মৃতি জাদুঘর সংস্কারকাজও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। সমাধির মূল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণসহ উদ্যান ও প্রাঙ্গণের সৌন্দর্যবর্ধন এবং সংস্কারকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
এ প্রকল্পটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কাজ সম্পন্ন হলে পুরো জিয়া উদ্যান এলাকা আবারও ঝলমলে হয়ে উঠবে।
আরও পড়ুন: নবম পে স্কেলে বেতন পেলেন সরকারি চাকরিজীবীরা, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন পাননি
১৯৮১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে চন্দ্রিমা উদ্যানে সমাহিত করা হয়। ১৯৯২ সালে এই স্থানটির নামকরণ করা হয় জিয়া উদ্যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে নাম পরিবর্তন করে চন্দ্রিমা উদ্যানে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার নাম পরিবর্তন করে জিয়া উদ্যান রাখে। ২০০২ সালে সেখানে মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিএনপি। পরবর্তীতে লেক ও ফোয়ারার সৌন্দর্যবর্ধন করে বিএনপি। ২০১০ সালের ৩ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার আবার নাম পরিবর্তন করে চন্দ্রিমা উদ্যানে। বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ শাসনামলে এই উদ্যানটি ছিল চরম অযত্ন এবং অবহেলিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে উদ্যানটির নাম চন্দ্রিমা থেকে পরিবর্তন করে জিয়া উদ্যান করা হয়, এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের নজরও পড়ে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এখানে সমাহিত করার পর উদ্যানটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমাধিসৌধের মূল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটের আওতায় জিয়া উদ্যান ও সমাধিস্থল এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি ২৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯৪ টাকা ব্যয়ে ২১টি পৃথক ক্যাটাগরিতে সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে যুক্ত কার্যবিবরণী ও প্রকল্পের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৩ কোটি ২ লাখ ৭ হাজার ১৮৮ টাকা ব্যয়ে সমাধিস্থলে অবস্থিত জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, আর্কাইভ ও গ্রন্থাগারের সিভিল ও ইলেকট্রিক্যাল কাজ এবং ফার্নিচার কেনার কাজ চলছে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল সংস্কার, ফ্লোরের মার্বেল পলিশ, উইং ওয়ালের গ্র্যানাইট, ক্যালিগ্রাফি প্রতিস্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য ২ কোটি ২৬ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদ্যানের ক্রিসেন্ট লেকের অকেজো ফোয়ারা সংস্কারের কাজে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি লেকের গাইড ওয়াল মেরামত, ফ্লাশ পায়েন্টিং, নিচের তলার সলিং মেরামতসহ আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ টাকা। ক্রিসেন্ট লেকের ওপর বিদ্যমান সেতুর ওয়ালে ওয়াটার পেপিলেন্ট ভাঙা মার্বেল নবায়ন, স্টিল ফ্রেমে রঙ করাসহ আনুষঙ্গিক সংস্কারে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ লাখ ৫ হাজার ৪০৬ টাকা। এ ছাড়া ক্রিসেন্ট লেকের দক্ষিণ পাশে ফুটপাতে (সি রোড) ইটের গাঁথুনি দিয়ে বেষ্টনী নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ লাখ ২৪ হাজার ৮৫৫ টাকা।
আরও পড়ুন: মেট্রো রেলের সব স্টেশন চালু, স্বাভাবিক হল চলাচল
জিয়া উদ্যানের অভ্যন্তরে ১ কোটি ২৬ লাখ ৯ হাজার ৪৮৩ টাকা ব্যয়ে ১৫০ মিমি ও ২৫০ মিমি ব্যাসের দুটি গভীর নলকূপ স্থাপন (সিংকিসহ), ৩৮ মিমি ব্যাসের টেস্ট ও অবজারভেশন ওয়েল নির্মাণ এবং ২০ এইচপি সাবমার্সিবল পাম্প মোটর সেট সরবরাহ ও স্থাপন এবং বহিঃস্থ পানি সরবরাহ পাইপলাইন তৈরি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া জিয়া উদ্যানের পূর্ব কোণে মেট্রো স্টেশনসংলগ্ন খালি জায়গায় ৪৭ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫ টাকা ব্যয়ে এবং উদ্যানের পশ্চিম পাশে পাম্পহাউজ-সংলগ্ন খালি জায়গায় ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬৪ টাকা ব্যয়ে নারী, পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পাবলিক টয়লেট ব্লক নির্মাণকাজ চলছে।
৭৫ লাখ ৩ হাজার ৩৫০ টাকা ব্যয়ে মসজিদ থেকে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্ত নতুন বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে উদ্যানের উত্তর পাশে। ৫৩ লাখ ৪৭ হাজার ১১৯ টাকা ব্যয়ে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে অবস্থিত অডিটরিয়ামে স্টেজ লাইট ও সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহ এবং ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ২৩৩ টাকা ব্যয়ে অডিটরিয়ামে এলইডি স্ক্রিন স্থাপন কাজ চলমান।
২৬ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫৩ টাকা ব্যয়ে সমাধিস্থলে ১০০ কেভিএ ইমার্জেন্সি জেনারেটর সরবরাহ ও আনুষঙ্গিক কাজ করা হচ্ছে। সমাধিস্থলে অবস্থিত মসজিদ, অডিটরিয়াম, জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, আর্কাইভ, পাঠাগারসহ অন্যান্য স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে ২৮ লাখ ২৭ হাজার ১৬৮ টাকা ব্যয়ে।
আরও পড়ুন: মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন: ১১ আ.লীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মী আটক
জিয়া উদ্যান মেমোরিয়াল হলের ফার্নিচার ক্রয় ও স্থাপন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২ লাখ ৮৫ হাজার ২৩৬ টাকা। সমাধিস্থলে অবস্থিত ৪০০ কেভিএ সাবস্টেশন মেরামত কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৭৪ টাকা।
মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স ভবনের টয়লেট ব্লকগুলোর টাইলস ও স্যানিটারি ফিটিংস নবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৪৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬১ টাকা। ৬৪ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৭ টাকা বাজেটে উদ্যানের ভেতরে পুকুরপাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
৩৫ লাখ ৫২১ হাজার ৯৭৭ টাকা ব্যয়ে সমাধিস্থলে অবস্থিত অডিটরিয়ামে স্ট্রিট টাইপ এসি সরবরাহ ও স্থাপনকাজ চলমান। উদ্যানের আরবি কালচার ও ল্যান্ডস্কেপিং উন্নয়ন কাজে ২১ লাখ ৬৯ হাজার ২১৭ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ ছাড়া সমাধিস্থলে অবস্থিত মসজিদের প্রয়োজনীয় সিভিল ও বৈদ্যুতিক কাজে ৪৭ লাখ ৮ হাজার ৮৮৬ টাকার দরপত্র প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজের গুণগত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জিয়া উদ্যান ও সমাধি প্রাঙ্গণকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক রূপে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তর।
আরও পড়ুন: ‘ডিসেম্বরকে টার্গেট করে আন্দোলনের অপচেষ্টা, জামায়াত-এনসিপি উসকে দিচ্ছে’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘জিয়া উদ্যান এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলের পুনঃসংস্কারকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। উদ্যানে আগত দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে সেখানে নানা কিছু যোগ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এসব কাজের বড় অংশগুলো শেষ হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন