১১:৪৪ পি.এম
বরিশাল নগরীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, স্থানীয়দের ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্যাতন ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আলোচিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিলন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে এবার বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে নগরীতে গোপনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক এবং পরবর্তীতে জেলা আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিলন ভূঁইয়া। তবে কিছুদিন পর তিনি আবার বরিশালে আসা-যাওয়া শুরু করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে মিলন ভূঁইয়া অর্থ সংগ্রহ করছেন। স্থানীয়দের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে এবং ভারতে অবস্থানরত প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগ্রহ করা ওই অর্থের একটি অংশ বরিশালে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ ও অল্প বয়সী ছেলেদের সংগঠিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
তাদের দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গভীর রাত অথবা ভোরের দিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করে ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। এসব মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী নন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং ওই অর্থ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর রাজনৈতিক আশীর্বাদে মিলন ভূঁইয়া জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তীতে তিনি বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বরিশাল নগরীর আইন কলেজ ও হাসপাতাল রোড এলাকায় মিলন ভূঁইয়া ও তার ঘনিষ্ঠরা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সে সময় রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, মিলন ভূঁইয়ার ছোট ভাই সুজন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও এলাকার মানুষকে বিভিন্ন সময় অপমান-অপদস্থ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। নেশার টাকা না পেলে স্থানীয়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং অশালীন আচরণের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুজন ভূঁইয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইন কলেজ ও হাসপাতাল রোড এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা।
তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি মিলন ভূঁইয়া বরিশালে আসা-যাওয়া শুরু করার পর তার ছোট ভাইয়ের আচরণ নিয়ে এলাকায় আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইন কলেজ এলাকার এক জুতার দোকান ব্যবসায়ী তালাশ বিডিকে বলেন,
“৫ আগস্টের পর আমরা মোটামুটি ভালোই ছিলাম। কিন্তু এখন আবার মিলন ভূঁইয়ার ছোট ভাইয়ের আচরণে আমরা অতিষ্ঠ। আমাদের ধারণা, মিলন ভূঁইয়া বিভিন্ন উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে তার ভাইকে আমাদের ওপর প্রভাব খাটাতে উৎসাহিত করছেন।”
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি এখনও স্থানীয়দের মনে রয়েছে। এ কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কোনো অভিযোগ করতে ভয় পান।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে মিলন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই অনিচ্ছুক। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগ করলে আবারও নানা ধরনের হয়রানি কিংবা সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগের অভিযোগ
মিলন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে থাকা কিংবা বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলতে বিভিন্ন কর্মসূচি ও কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
## স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রকাশ্যে চলাফেরা কীভাবে?
এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের অনেক প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন, কেউ কেউ আত্মগোপনে আছেন এবং অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে মিলন ভূঁইয়ার মতো একজন সাবেক ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতা কীভাবে প্রকাশ্যে বরিশালে চলাফেরা করছেন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না—সে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি যদি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি, নির্যাতন কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচিত ছিলেন, মিলন ভূঁইয়া ও তার সহযোগীরাও স্থানীয়ভাবে এমন অভিযোগের মধ্যে ছিলেন বলে দাবি করেছেন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা।
## মায়ের অভিযোগ ও পারিবারিক বিরোধ
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরিশাল আইন কলেজ কম্পাউন্ড এলাকার ভূঁইয়া পরিবারের সদস্য মিলন ভূঁইয়া ও তার ভাই সুজন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধা মা এবং ছোট ভাই সজলকে নির্যাতন ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
তাদের মা সে সময় গণমাধ্যমের কাছে তার দুই ছেলে মিলন ভূঁইয়া ও সুজন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন বলেও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, পারিবারিক সম্পত্তি ও অন্যান্য বিরোধকে কেন্দ্র করে সংবাদ প্রকাশের পর মিলন ভূঁইয়া এবং তার স্ত্রী সাবেরা বেগম চৌধুরীর বিরুদ্ধে সজল ও তাদের বৃদ্ধা মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট একটি অডিও রেকর্ড সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই অডিও রেকর্ডের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
## বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা
এসব অভিযোগের বিষয়ে মিলন ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
তালাশ বিডির পক্ষ থেকে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বক্তব্য দিলে তা যথাযথভাবে এই প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
## পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার কার্যালয়ের এসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তালাশ বিডি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন,
“আপনারা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করেন। আমরা বিষয়টি দেখব এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো নেতাকর্মীর ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।”
স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা, সাথে কথা বলে সংবাদ তৈরি করা হয়েছে। মিলন ভূঁইয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে পরবর্তী প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন