০৬:২৩ পি.এম
বাংলাদেশের ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমান সক্ষমতার সাথে একটি বিশাল ঘাটতি বিদ্যমান। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৯৩৩ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ, ব্যাটারি স্টোরেজ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি তথ্যভাণ্ডার, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তা অপরিহার্য।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টায় ড্যাক্কা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (দাইরা) কর্তৃক আয়োজিত ‘বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর : ২০৩০ সালের ঘাটতি পূরণ ও সামনের অর্থনৈতিক সুযোগ’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব বিষয় তুলে ধরেন।
ওয়েবিনারের শুরুতে দাইরার গবেষক সুবর্ণা আক্তার লাবনী একটি নীতিবিষয়ক গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রিড বিদ্যুতের প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপন্ন হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ২০ শতাংশে উন্নীত করা। তবে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মাত্র প্রায় ৩৫৮ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা নির্মাণাধীন রয়েছে। লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে।
আরও পড়ুন: শুধু ৯ দেশ-ই নয়, বিশ্ব এক হলেও হারবে? কারণ- ইয়েমেনের জন্য নবী (সা.) দোয়া করেছিলেন!
গবেষণায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ৯ টাকা ৫০ পয়সা, যেখানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ২৫ টাকা। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গবেষণায় আরো বলা হয়, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবছর আনুমানিক ৯৩৩ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসংস্থান তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতি মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২৬ দশমিক ৬টি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যেখানে ইউটিলিটি-স্কেলের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াটে কর্মসংস্থান হয় প্রায় ২ দশমিক ১টি।
বিদ্যুৎ গ্রিড ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাও গবেষণায় তুলে ধরা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ৫১৫ মিলিয়ন ডলারের বিশ্বব্যাংকের একটি গ্রিড কর্মসূচি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘মাঝারি মাত্রায় অসন্তোষজনক’ হিসেবে মূল্যায়িত হয়। কর্মসূচিটির আওতায় ০ দশমিক ১৫ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে প্রায় ০ দশমিক ০৪ গিগাওয়াট।
গবেষণায় বলা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সম্মিলিত সক্ষমতার ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করা হয়। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকল্পগুলো পুনরায় পর্যালোচনার জন্য খোলা হয়। এছাড়াও ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক সুবিধা এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রণোদনা চালুর বিষয়ও আলোচনায় আসে।
আরও পড়ুন: জাপান বাংলাদেশে সাড়ে ৭৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা
আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহার্টি জ্বালানি রূপান্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন পক্ষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা এবং সরকারি অর্থের ব্যবহারে স্পষ্ট নজরদারি নিশ্চিত করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি মানেই আমলাতন্ত্র—এ ধারণাটি দেখার একটি ভুল পদ্ধতি।’ তার মতে, তথ্য প্রকাশ এবং অভিন্ন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আস্থা বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো কার্যকর করা সম্ভব।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে র্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার্সের সিওও (COO) এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের অ্যাডজাঙ্ক্ট ফ্যাকাল্টি মোহাম্মদ সুবাইল বিন আলম বলেন, ‘আমরা প্রস্তুত নই।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান গ্রিড মূলত সীমিতসংখ্যক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একমুখী বিদ্যুৎ প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে তৈরি। কিন্তু ছাদভিত্তিক ও বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটাতে হলে দ্বিমুখী বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক, উন্নত ট্রান্সফরমার, SCADA-এর মতো আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং বেশি মাত্রায় ব্যাটারি স্টোরেজ প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত করতে হলে সঞ্চালন, উৎপাদন ও পর্যবেক্ষণ অবকাঠামোর পরিকল্পনা একসঙ্গে করতে হবে। পাকিস্তানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত স্টোরেজ ও গ্রিড পরিকল্পনা ছাড়া দ্রুত সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন: রিয়াদ বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো যাত্রীদের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি বার্তা
এ জন্য অন্তত পাঁচ বছরের নীতিগত নিশ্চয়তা, টেকসই ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, SREDA ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সহজ শর্তের অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
দ্য ডেইলি জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদক মো. ইসমাইল আলী জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি একটি কেন্দ্রীয় ও সবার জন্য উন্মুক্ত ডিজিটাল জ্বালানি তথ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। তার মতে, নিয়মিত হালনাগাদ এই তথ্যভাণ্ডারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা, স্থাপিত সক্ষমতা এবং প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদনের তথ্য তুলনা করার সুযোগ থাকা উচিত।
তিনি বলেন, অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের নীতির স্থায়িত্ব প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদি নীতি ও প্রণোদনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের অর্থায়ন কার্যকরভাবে করা কঠিন।
ওয়েবিনারের সঞ্চালক দাইরার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সাকিব বিন আমিন বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সঞ্চালন ও বিতরণে ক্ষতির হার প্রায় ১০ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিকভাবে তা প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ। ফলে বিদ্যুৎব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: সরাইল থানায় গিয়ে ওসির ওপর চটলেন এমপি রুমিন ফারহানা
তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (PPP), বিশেষ করে বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার (BOT) মডেল ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি তথ্যকেন্দ্র ও পরিবেশগত মান পরিষদ গঠন, বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভর্তুকি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি দক্ষতা ও চাহিদা ব্যবস্থাপনা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পূর্বানুমানযোগ্য নীতিপরিবেশ জরুরি। প্রণোদনায় ঘন ঘন পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অস্পষ্টতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং সহজলভ্য অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার পথে বাধা তৈরি করতে পারে।
সমাপনী বক্তব্যে ড. সাকিব বিন আমিন বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং তা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘নীতিকে প্রকল্পের সঙ্গে, প্রকল্পকে অর্থায়নের সঙ্গে, অর্থায়নকে অবকাঠামোর সঙ্গে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকে এমন একটি গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যে গ্রিড নির্ভরযোগ্যভাবে সেই বিদ্যুৎ গ্রহণ ও সরবরাহ করতে সক্ষম।’
ওয়েবিনারে একাডেমিয়া, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দাইরার টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের উদীয়মান নীতিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়।
আরও পড়ুন: সরকার নাগরিকদের জীবন রক্ষায় উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ: সিপিবি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন