১০:৪৪ এম
যুদ্ধটি দ্রুত শেষ হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। তবে ছয় মাসের পরেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানকে পরাজিত করতে পারেনি। ব্যাপক বিমান হামলার ফলে ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধিত হয়েছে। নিহত হয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। তবুও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, এবং জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নামেনি।
বর্তমানে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনের নতুন লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলা। তাদের আশা, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেবে।
আরও পড়ুন: আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনকে লজ্জাজনক বললেন নেতানিয়াহু
অর্থনীতিবিষয় জানা
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নাও আনতে পারে।
ছয় মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ওয়াশিংটন আসলে কী চায়—ইরান সরকারের পতন, আত্মসমর্পণ, নাকি আলোচনায় সমঝোতা? এর কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মন্তব্য, ‘এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।’
আরও পড়ুন: নায়ক মান্নার গাড়িতে আগুন, গ্রেফতার দুজন কারাগারে
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের প্রধান সুজান ম্যালোনিও যুদ্ধের ফলাফলকে ব্যর্থ বলে মনে করেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যাপক ক্ষতি করেছে, কিন্তু ইরান এখন আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা’ কোথায়?
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের সূচনা দিবসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে।’
ছয় মাস পর, তার প্রশাসন ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ আরোপ করছে। লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। বরং ইরানের নেতৃত্ব আরও কঠোর হয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। শাসকরা নিজেদের টিকে থাকাকে দেশের টিকে থাকা হিসেবে বিবেচনা করছেন। সাধারণ মানুষের ত্যাগকে তারা দেশপ্রেম এবং শহীদের মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করছেন। সামান্যতম ভিন্নমতও কঠোর হাতে দমন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: লুলার বিজয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা, ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ
ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে নত করার প্রচেষ্টা সফল হয়নি, এবং ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও এখন অনেকটাই ফাঁপা শোনাচ্ছে।
ম্যাপরেফারেন্স দেখা
বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত, তবু অটুট ইরান
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং তার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। গুরুতর আহত হন তার ছেলে এবং বর্তমান উত্তরসূরি সাইয়েদ মুজতবা খামেনি।
আরও পড়ুন: ঘিওরের ধলেশ্বরী নদীতে দুই দিন নিখোঁজ বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার
কয়েক সপ্তাহের তীব্র বোমাবর্ষণে ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও। কিন্তু এতেও সরকারের পতন হয়নি। নেতৃত্বে বড় কোনো ভাঙন দেখা যায়নি। জনগণও রাস্তায় নামেনি। বরং ইরানের সামরিক বাহিনী অনেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা আবার সচল করে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
সবচেয়ে বড় পাল্টা পদক্ষেপ আসে হরমুজ প্রণালিতে। তেহরান একপর্যায়ে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এই যুদ্ধে কয়েক হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। নিহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। এ ছাড়া ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
এবার অস্ত্র অর্থনীতি
সামরিক অভিযান এখন অর্থনৈতিক চাপের দিকে পরিবর্তিত হয়েছে। গত সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য হলো ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেওয়া।
আরও পড়ুন: রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ সেন্ট হতে পারে
ব্যাসেন্ট বলেন, ইরানের ‘প্রতিটি শেষ বিকল্প’ বন্ধ করাই এই অভিযানের লক্ষ্য। অভিযানের শক্তি প্রতিদিন বৃদ্ধি পাবে এবং ইরানের সরকার একা না হওয়া পর্যন্ত এটি চলবে বলেও জানান তিনি।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন—এর শেষ কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সরকার পতন চায়? হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে তেহরানকে বাধ্য করতে চায়? নাকি অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চায়?
অর্থনীতিবিষয় জানা
আরও পড়ুন: ড্যাবের বিরুদ্ধে আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের অভিযোগ
লন্ডনভিত্তিক বোরস অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের গবেষক এসফানদিয়ার বাটমাঙ্গেলিজদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য স্পষ্ট নয়।
তার মতে, কী ধরনের আচরণ পরিবর্তন চাওয়া হচ্ছে, সেটি নির্দিষ্ট না করলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো দেশকে বাধ্য করা যায় না।
ইরানের ওপর এরই মধ্যে হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই আরো নিষেধাজ্ঞায় তেহরান আত্মসমর্পণ করবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বরং পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইরান পারস্য উপসাগরে জাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা বাড়াতে পারে। এতে আবারও মার্কিন সামরিক হামলার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক সিনা তুসির ভাষায়, ‘ইরানকে ক্ষতি করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কিন্তু সেই ক্ষতি থেকে আত্মসমর্পণ বা সরকার পতনের পথটি স্পষ্ট নয়।’
সমঝোতার পথও ক্রমে সরু
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অস্পষ্ট হওয়ায় তেহরানেও প্রশ্ন বাড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, ইরানের নেতৃত্ব জানতে চাইছে—যুক্তরাষ্ট্র কি পতন চায়, আত্মসমর্পণ চায়, নাকি সমঝোতা?
ইরান মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধকে যুদ্ধেরই আরেক রূপ হিসেবে দেখছে। তাই নতুন মার্কিন কৌশলে দুটি বড় ঝুঁকি রয়েছে।
চাপ ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন আবার সামরিক পথে ফিরতে পারে। আর চাপ সফল হলে ইরান মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙতে আরো বড় পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
ভায়েজের মতে, নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের বিকল্প হওয়ার বদলে নতুন যুদ্ধের ভূমিকা তৈরি করতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুদ্ধ শেষ করার অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তারা সতর্ক করেছেন, ক্ষুধার্ত মানুষ ও অর্থনৈতিক ধস ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তবুও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের অবস্থান কঠোর। ইরান অন্তত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরতে চায়। ওই সমঝোতায় ট্রাম্পও স্বাক্ষর করেছিলেন। এখন অবশ্য তিনি সেটিকে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেছেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইরান ও ওমান আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের ব্যবস্থা মেনে নেবে, তার সঙ্গে তেহরানের অবস্থানের বড় ফারাক রয়েছে। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হলেও হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয় ইরানের নেতৃত্ব। একই সঙ্গে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির ওপরও তাদের আস্থা নেই। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়েও গভীর সন্দেহ রয়েছে।
যুদ্ধ নেই, শান্তিও নেই
বর্তমানে সংঘাত অনেকটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। দুই পক্ষ সরাসরি একে অপরের ওপর হামলা চালাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালির দুই দিকের অবরোধও তুলনামূলকভাবে শিথিল। ফলে কিছু তেল সরবরাহ হচ্ছে।
এই অবস্থাকে বিশ্লেষকেরা একধরনের ‘ভুয়া যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন।
অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের একটি সুবিধা হলো, এর প্রভাব ধীরে আসে এবং সহজে পরিমাপ করা যায় না। এতে সংঘাতের উত্তাপও কিছুটা কম থাকে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এটি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। বিজয় খুব কাছে—এমন বার্তাও দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু এই অচলাবস্থাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
অর্থনীতিবিষয় জানা
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমায়েহ বলেন, হোয়াইট হাউসে এখন ক্রমেই এমন ধারণা বাড়ছে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব নয়। একই ধারণা তৈরি হচ্ছে তেহরানেও।
তার সতর্কবার্তা, ‘এটি বিপজ্জনক সময়।’ কারণ দুই পক্ষই যদি ধরে নেয় যে অন্য পক্ষের সঙ্গে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়, তাহলে সংঘাত আবার সামরিক পথে গড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জেরেমি শাপিরোও প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কেন এই দীর্ঘ ও দেশে অজনপ্রিয় যুদ্ধ শেষ করার কোনো পথ বেছে নিচ্ছেন না।
তার মতে, আরো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এমন ভান করছে যে যুদ্ধ এখনো চলছে। অথচ তারা চাইলে যুদ্ধ জয়ের দাবি করতে পারত। অথবা স্বীকার করতে পারত যে তারা হেরে গেছে।
ছয় মাসের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন সত্যই সামনে এনেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরানকে আঘাত করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু তাকে নত করার পথ নেই। আর যুদ্ধের সেই অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন ইরানের সাধারণ মানুষ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন