০৬:৫০ এম
টোকিও থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত দক্ষিণের শান্ত ও স্নিগ্ধ উপকূলীয় শহর ফুজিসাওয়া। চারদিকে সবুজে ঘেরা একটি সাধারণ ঘাসের মাঠ আজ টক অব দ্য টাউন হয়ে উঠেছে। কারণ, খুব শীঘ্রই এই জায়গাতেই গড়ে উঠতে যাচ্ছে শহরটির ইতিহাসের প্রথম মসজিদ। তবে, এই ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের বাসিন্দা নোরিকো ইজুমিজাওয়া নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের সমাজ কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা নিয়ে আমি বেশ উদ্বিগ্ন।" ফুজিসাওয়ায় ইসলামিক কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের মাঝে আশা, ভয়, ক্ষোভ ও গ্রহণযোগ্যতার এক অদ্ভুত দোলাচল সৃষ্টি করেছে। জাপানের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগণের সংখ্যার সাথে তীব্র শ্রমসংকটের সংকটের মুখে অভিবাসনের বিষয়টি দিন দিন অনিবার্য হয়ে উঠছে, তবে সামাজিক পরিবর্তনের এই ঢেউ স্থানীয়দের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহ্যগতভাবে, অভিবাসন নিয়ে জাপান কঠোর ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও, কাজের প্রয়োজনের জন্য এখন দেশটি বিদেশি কর্মীদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের মানুষের আগমন ঘটছে দেশটিতে। ফুজিসাওয়ার মতো জনপদগুলোতে চলা এই বিতর্কটি মূলত জাপানিদের আত্মপরিচয়ের গভীরে আঘাত হানছে। ইজুমিজাওয়ার মতে, আমেরিকা ও ইউরোপের মেরুকরণমূলক অভিবাসন বিতর্কও তাদের মনে এই অস্বস্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
আরও পড়ুন: দীর্ঘ যাত্রায় চালকের ক্লান্তি, বাড়ছে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি
চলতি বছরের শুরুর দিকে স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনের সামনে মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে এই প্রস্তাবিত নির্মাণের প্রতিবাদ জানান। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, কাছাকাছি অবস্থিত প্রাচীন শিন্তো মন্দিরের তুলনায় বিশাল আকৃতির মসজিদ নির্মাণ ঐতিহ্যের প্রতি এক ধরনের অসম্মান। একইসঙ্গে, জাপানি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের ভুল তথ্য ও ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগও উঠছে। বেশ কিছু মসজিদ অবমাননাকর ফোন কল ও ইমেলের মুখোমুখি হয়েছে, যার প্রতিবাদে বর্ণবাদবিরোধী গ্রুপগুলো পাল্টা সমাবেশ করেছে।
তবুও, শহরের বাসিন্দাদের বিরোধিতা এবং সমর্থন উভয় সুরে শোনা যাচ্ছে। মসজিদ নির্মাণের নির্ধারিত সাইটের ঠিক বিপরীত দিকের একটি কফি শপের ব্যবস্থাপক হিরোকি সুজুকা বলেন, "আমি এর সম্পূর্ণ বিরোধীও নই, আবার প্রবল সমর্থকও নই।" তিনি বলেন, "আমার মতে, প্রথম কাজ হলো তাদের সম্পর্কে জানা, ইসলাম ধর্ম ও তাদের মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া।" খোলামেলা মন এবং একে অপরকে বোঝার ইচ্ছাই এই ব্যাপারের চাবিকাঠি।
জাপানে মুসলমান হিসেবে জীবন কাটানোর অভিজ্ঞতা ভূতপূর্ব বৈচিত্র্যময়। প্রায় ৩৯ বছর আগে শ্রীলঙ্কা থেকে ওসাকায় পাড়ি জমান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহিদিন। তাঁর মতে, আগের তুলনায় স্থানীয় মানুষ এখন অনেক বেশি প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। অনলাইনে কিংবা সরাসরি মুসলমানদের লক্ষ্য করে কটু মন্তব্য ছুড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাপান ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো অবমাননাকর মন্তব্য এবং মসজিদে এসে চিৎকার করে গালিগালাজ করার ঘটনাও ঘটে।
তবে, ওসাকার স্থানীয় মসজিদে নিয়মিত যাতায়াতকারী মহিদিন কখনো নিজের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন না। দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্কের পরও সাম্প্রতিক সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তার চোখে পড়েছে। তবে, এর পেছনে উভয় পক্ষেরই কিছু দায় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, "এতদিন তারা কেবল কাজের পেছনেই ছুটেছেন এবং স্থানীয় সমাজে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে বা একীভূত হতে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালাননি।" ভবিষ্যতে সংলাপ ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি করার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন: চীনে নদীর তলদেশে ট্রেন চলাচল, আলোর লেজারের প্রদর্শনী পর্যটকদের মুগ্ধ করছে
অন্যদিকে, সাইতামা প্রিফেকচারের ইয়াসিও মসজিদের প্রতিনিধি শাকিল মোহাম্মদ গত এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। পাকিস্তান থেকে জাপানে আসার পর তিনি প্রায় ২৬ বছর ধরে নির্মাণ খাতে সুপারভাইজর হিসেবে কাজ করছেন এবং সাবলীল জাপানি ভাষায় কথা বলেন। তিনি মনে করেন, জাপানের নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। নিয়ম মাফিক আবর্জনা ফেলা, পার্কিং আইন অনুসরণ করা এবং বাইক চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার করা সহ সাধারণ শিষ্টাচার বজায় রাখা প্রতিটি অভিবাসীর দায়িত্ব।
জাপান যখন এক বিরাট জনমিতিক পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখার লড়াই চালাচ্ছে, তখন এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ জাপানে বিদেশি ও স্থানীয় মিলিয়ে মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার, যা ২০১৯ সালে ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার। একইসঙ্গে ২০২৩ সালে জাপানের সামগ্রিক বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা চার মিলিয়ন ছাড়িয়েছে, তবে দেশের নিজস্ব জনসংখ্যা প্রায় দশ লাখ কমে গেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা ঐতিহাসিকভাবে জাপানকে অভিবাসী দেশ হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ এবং তারা অপেক্ষাকৃত স্বল্পমেয়াদি ভিসার ওপর বেশি জোর দিয়ে থাকেন। তবে, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন সরকার কঠোর রক্ষণশীল নীতি বজায় রেখে গত জুন মাসে প্রায় অর্ধশত বছর পর বিদেশি নাগরিকদের ভিসার ফি পাঁচগুণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তাছাড়া অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের মোকাবেলায় ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সির জনবল বাড়ানো এবং বিদেশি বাসিন্দাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নতুন সীমানা নির্ধারণের পরিকল্পনা চলছে।
সূত্র: বিবিসি
আরও পড়ুন: দু’পক্ষই আগ্রহী হলে ইরান-মার্কিন বিরোধে মধ্যস্থতায় প্রস্তুত রাশিয়া
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন