০৪:২০ পি.এম
সময়ের সাথে সাথে দৌড়াচ্ছেন ব্রাজিলের প্রভাবশালী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
গায়ে জামা পরা নেই। তিনি ট্রেডমিলে দৌড়াচ্ছেন। শরীর ঘামে ভিজে উঠছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলার। তিনি দৌড় থামাচ্ছেন না। ৮০ বছর বয়সেও তিনি প্রমাণ করতে চান, আসন্ন অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো জয়ী হওয়ার জন্য তাঁর শক্তি ও সামর্থ্য এখনও রক্ষা করা আছে।
আরও পড়ুন: আসামে মুসলিমদের ১১০০ ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নিন্দা নাহিদ ইসলামের
বার্তা সংস্থা এএফপি রিও দি জেনেইরো থেকে এ খবর দিয়েছে।
চার দশক ধরে তিনি ব্রাজিলের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা। তিনি নিয়মিতভাবে নিজের ব্যায়ামের ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর ঘূর্ণন বা সময়ের প্রবাহ কেউ থামাতে পারে না।’
বামপন্থি এই নেতা নির্বাচনে পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। ৫৮০ দিন তিনি কারাগারেও ছিলেন। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর রাজনৈতিক অপমানেও ভুগেছেন। কিন্তু পরে সেই দণ্ড বাতিল হয়, তবুও ডানপন্থিদের কাছ থেকে এখনো তাঁকে কটূক্তি শুনতে হয়।
আরও পড়ুন: ঢাকা-সৌদি আরব রুটে ১৩৪ ফ্লাইট বাতিল, ২০ হাজার যাত্রী আটকে
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও নানা সংকট তিনি মোকাবিলা করেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে বাথরুমে পড়ে গিয়ে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটেছিল।
এই ঘটনার পর থেকে তাঁকে প্রায়ই পানামা টুপি পরতে দেখা যায়। এক সময়ের ঘন কালো চুল এখন কাছে পেকে গেছে, পাতলা হয়ে এসেছে। তাঁর পরিচিত দাড়িতে বয়সের ছাপও রয়েছে।
তবে লুলার দাবি, তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক ফিট। তাঁর স্বপ্ন, ‘১২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকা’।
-দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া-
আরও পড়ুন: ভারতে যাওয়ার পথে যুব মহিলা লীগ নেত্রী সুলতানা বেগম আটক
লুলার জন্ম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শুষ্ক প্রদেশ পারনামবুকে। তিনি নিরক্ষর কৃষক পরিবারের আট সন্তানের মধ্যে সপ্তম।
শৈশবে তিনি জুতা পালিশ এবং বাদাম বিক্রির কাজ করে জীবন অতিবাহিত করেছেন। পরে তিনি ধাতব কারখানার শ্রমিক এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হন। ১৯৬০-এর দশকে কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় তাঁর একটি আঙুল কেটে যায়।
টানা তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারার পর ২০০৩ সালে তিনি প্রথমবার ব্রাসিলিয়ার প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রবেশ করেন। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হন।
২০১০ সালে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন একজন শ্রমজীবী মানুষের নায়ক হিসেবে। পণ্য রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় তাঁর নেতৃত্বে প্রায় তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে।
আরও পড়ুন: ইসলামী আন্দোলনের প্রশ্ন, আঁতাতের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
কিন্তু লুলা এবং তাঁর দলকে বড় বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারি তাড়া করে বেড়ায়। জনঅসন্তোষের সেই ঢেউয়ের ওপর ভর করে ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসেন কট্টর ডানপন্থি নেতা জাইর বোলসোনারো।
একই বছর লুলাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে বিচারপ্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে মামলাটির অভিযোগ বাতিল করা হয়। মামলার প্রধান বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন, তা প্রমাণিত হয়।
তবে লুলাকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়নি। সেই কেলেঙ্কারি ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজনকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
বোলসোনারোর শাসনামলও ছিল বিভক্তিকর। ২০২২ সালের নির্বাচনে খুব অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়ে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতায় ফেরেন লুলা।
আরও পড়ুন: শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে চুরি হওয়া লাগেজ উদ্ধার, একজন গ্রেফতার
পরে ক্ষমতায় ফিরে আসা ঠেকাতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার দায়ে বোলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়।
‘ব্রাজিলের বাইডেন’-
ক্ষমতায় ফিরে আসার পর শুরুতে মনে হচ্ছিল, নতুন করে ব্রাজিলকে চেনার চেষ্টা করছেন।
২১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই অত্যন্ত সংযুক্ত দেশে তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার চেষ্টায় আছেন। দেশটি ভুয়া তথ্যের বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন: বিএনপির এমপির ফুলেল শুভেচ্ছা, সাধারণ সম্পাদককে শোকজ
তাঁর কৃতিত্বের মধ্যে রয়েছে পূর্বসূরির বাতিল করা সামাজিক কর্মসূচিগুলো পুনরায় চালু করা, আমাজন রেইনফরেস্ট ধ্বংস কমানো এবং ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে আরো স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
তবে তাঁর তৃতীয় মেয়াদকে বেশ কয়েকজন আগের কালের ম্লান পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখেন। নতুন কোনো বড় ধারণা খুব একটা মনে হয় না। পাঁচ সন্তানের পিতা লুলা এখনও মূল্যস্ফীতি, অপরাধ ও দুর্নীতির জন্য বিরক্ত ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যাত।
২০২২ সালে লুলা বলেছিলেন, তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন না।
তাহলে কেন তিনি এবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, ৪৫ বছর বয়সী সিনেটর এবং তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জাইর বোলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে ফ্লাভিও বোলসোনারোর মুখোমুখি হচ্ছেন?
লুলা, যিনি সম্ভাব্য কোনো উত্তরসূরি গড়ে তোলেননি, তিনি বলেছেন, কট্টর ডানপন্থীদের আবার ক্ষমতায় ফিরে আসা দেশকে ‘ধ্বংস’ করতে দিতে হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদেশি কূটনীতিক এএফপিকে জানিয়েছেন, ‘তিনি খুব ফিট।’ লুলাকে ‘নির্বাচনী প্রচারের দুর্দান্ত যোদ্ধা’ বলা হয়েছে।
তবে ফ্লাভিও বোলসোনারোর মন্তব্য ভিন্ন।
লুলার কাছে জো বাইডেন এক প্রকার সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে তখনকার আশির কোঠার মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য শারীরিক ও মানসিক অবনতি বিষয়টি ব্রাজিলের এই নেতার ওপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।
তাঁর বিরামহীন সফরসূচি ও তাৎক্ষণিক রসবোধ এখনও তাঁর কর্মক্ষমতার প্রমাণ দেয়। পাশাপাশি তিনি বলেন, তাঁর তৃতীয় স্ত্রীর বয়স ৫৯ বছর, রোসাঞ্জেলা দা সিলভাই তাঁকে তরুণ রাখতে সহায়তা করেন।
অক্টোবরে যদি তিনি পরাজিত হন, তবে যে গৌরবময় সমাপ্তি তিনি চান, তা হয়তো পাবেন না। তবুও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অটুট থাকবে।
২০২৪ সালে এএফপিসহ বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছিলেন, ‘এই দেশে আমার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ প্রেসিডেন্ট আর কেউ নেই।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন