১২:৩২ পি.এম
মহাকাশে থাকা একটি পুরনো দূরবীক্ষণ যন্ত্রকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এ বছরের গ্রীষ্মে একটি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছিল। সেই অভিযানের জন্য একটি রোবটচালিত মহাকাশযানও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। বর্তমানে, নাসার ওই দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি বুধবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎক্ষেপণের প্রায় ২২ বছর পর এমন পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে যন্ত্রটি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নিল গেরেলস সুইফট অবজারভেটরি নামের এই মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের ওজন প্রায় ৩ হাজার ২০০ পাউন্ড বা ১ হাজার ৪৫২ কেজি। নাসা জানিয়েছে, এটি কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলের কোথাও পুড়ে ধ্বংস হবে। তবে, এর কিছু অংশ অক্ষত থাকতে পারে, কিন্তু জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানার সম্ভাবনা খুবই কম।
নাসা একটি অনলাইন বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, এ ঘটনায় পৃথিবীর কোনো মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২ হাজার ১০০ ভাগের মধ্যে মাত্র এক ভাগ। নাসার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ভোর ৩টা ৩০ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিট) যন্ত্রটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে।
আরও পড়ুন: বিজয় দাবি করে আবদুল আল-সাইয়েদ বললেন, সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার গুরুত্ব
অন্যদিকে, অলাভজনক গবেষণা সংস্থা অ্যারোস্পেস করপোরেশন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ভোর ৫টা ১৯ মিনিটে এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এই সময়ের দুই ঘণ্টা আগে বা পরে ঘটনাটি ঘটতে পারে। লন্ডনভিত্তিক জ্যোতির্পদার্থবিদ জোনাথন ম্যাকডাওয়েল যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বাহিনীর হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে আরেকটি পূর্বাভাস দিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে যন্ত্রটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
মঙ্গলবার রাতে রয়টার্সকে তিনি বলেন, উপগ্রহটি প্রায় বৃত্তাকার কক্ষপথে রয়েছে এবং এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের একেবারে ওপরের অংশের কাছে ঘুরছে। এখন দেখার বিষয়, কখন এটি এত বেশি উত্তপ্ত হবে যে ভেঙে টুকরো টুকরো হতে শুরু করবে।
নাসার প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি সুইফট উপগ্রহটি ছিল এ ধরনের প্রথম মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এতে তিনটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র রয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে এটি মহাকাশের গামা রশ্মির বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এই উপগ্রহের নিজস্ব কোনো চালনা ব্যবস্থা নেই, ফলে কয়েক মাস ধরে এটি ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে নেমে আসছিল। এটি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘণ্টায় প্রায় ১৭ হাজার মাইল বা ২৭ হাজার ৩৫৯ কিলোমিটার গতিতে ঘুরছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন, উপগ্রহটিকে উঁচু কক্ষপথে তুলে এর কাজের মেয়াদ কয়েক বছর বাড়ানো সম্ভব হবে। এজন্য, গত জুলাইয়ে নাসা ও যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্ট একটি বিশেষ উদ্ধারকারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করে। এর নাম ছিল ‘লিংক’। মহাকাশে সুইফটের কাছে পৌঁছে সেটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং টেনে আরো উঁচু ও দীর্ঘস্থায়ী কক্ষপথে নিয়ে যাওয়াই ছিল লিংকের উদ্দেশ্য। কিন্তু মহাকাশে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই লিংক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরতে শুরু করে। পরে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে অভিযান পরিচালনাকারীরা উদ্ধার প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেন। ফলে সুইফটকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় থাকেনি।
আরও পড়ুন: মিশিগানে ইতিহাস গড়ার পথে আবদুল এল-সায়েদ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম এ ধরনের উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হলেও এর গুরুত্ব ছিল অনেক। কারণ, এতে নতুন এক ধরনের মহাকাশ প্রযুক্তি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা ছিল। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি মহাকাশযান অন্য একটি মহাকাশযানকে ধরে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় এ ধরনের প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। উপগ্রহের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সামরিক কাজে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। লিংক অভিযানটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল, কারণ, উপগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল এতে।
ক্যাটালিস্ট এই অভিযানকে একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, নাসার ৩ কোটি ডলারের চুক্তির আওতায় মাত্র ৯ মাসে লিংক মহাকাশযানের নকশা তৈরি, নির্মাণ ও পরীক্ষা করা হয়েছে। এত কম সময়ে এ ধরনের কাজ আগে হয়নি বলেও দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি। মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণ নিয়ে গবেষণার জন্য দুই দশকেরও বেশি সময় আগে সুইফট উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এসব বিস্ফোরণের ফলে প্রচণ্ড শক্তিশালী গামা রশ্মি তৈরি হয়, যা দূরের ছায়াপথগুলোর কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসে।
শুরুতে সুইফটের কাজের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র দুই বছর। তবে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে এটি কাজ করেছে। এই সময়ে মহাকাশের নানা ধরনের বস্তু ও ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে উপগ্রহটি। এর মধ্যে রয়েছে অতি ভারী কৃষ্ণগহ্বরের শক্তিতে সক্রিয় থাকা ছায়াপথ, এক্স-রে বিকিরণ ছড়ানো নক্ষত্র, ধূমকেতু এবং সৌরজগতের মধ্য দিয়ে দ্রুত ছুটে চলা গ্রহাণু।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ফ্লোরিডা পেতে যাচ্ছে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন