০৫:৩০ পি.এম
রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। যদিও সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পুরো নিয়োগ কার্যক্রম আসলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের লিখিত নির্দেশনা, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) বিশেষ অনুমোদন ও মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ধারাবাহিকতায় সম্পন্ন হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, অনুমোদন ও কমিটির সুপারিশ ছিল, সেই প্রক্রিয়ার দায় কি শুধু একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার? নাকি তদন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরের ভূমিকা একসঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে?
এই প্রতিবেদকের কাছে থাকা সরকারি নথি অনুযায়ী, গত ২৩ জুন ২০২৬ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমুল কবিরের স্বাক্ষরিত কপির স্মারক নম্বর: ১৭,০০,০০০০.০১৬.১১.০১৫.২১-৩১৫ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সচিবালয় দেশের সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের নির্দেশনা প্রদান করে। একই দিনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) ই-জিপির পরিবর্তে ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) অনুসরণের অনুমোদন দেয়। নির্দেশনাটি ৩০ জুনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেয়।
আরও পড়ুন: কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে গিয়ে হতাশ পর্যটকরা
এরপর ২৪ জুন সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমুল কবীরের স্বাক্ষরিত কপিতে স্মারক নম্বর: ১৭,০০,০০০০.০১৬.১১.০১৫.২১-৩১৬ এ মূল্যায়ন কমিটি গঠন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলে, ২৫ জুন দরপত্র আহ্বানের জন্য তৎপরতা শুরু হয় এবং ২৭ জুন স্মারক নম্বর-১৭.০৪.০০০০.০০০.০৮১.০০৬.২৬-৫৭৩ এ মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সুপারিশ প্রণয়ন করা হয় এবং ২৯ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডকে কার্যাদেশ (Notification of Award) প্রদান করা হয়। একই দিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের নির্বাচন কার্যালয়গুলোতে ৫ জন চালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ৬৯ জন নিরাপত্তা প্রহরীসহ মোট ১৪৩ জন জনবল সরবরাহের দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পৃথক নির্দেশনায়, আগে থেকেই কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়। এর ফলস্বরূপ ১৩৭ জন কর্মরত কর্মীর তালিকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাঠানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি ১৪৩ জনের চূড়ান্ত তালিকা জমা দিলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে তারা পর্যায়ক্রমে যোগদান করেন।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে যে নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে এবং কোনো লিখিত অথবা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উত্থাপনের পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করে।
তবে, এই প্রতিবেদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী পাওয়া নথিপত্রে নিয়োগ কার্যক্রমের নানা ধাপের অনুমোদন, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ ও চুক্তির তথ্য পাওয়া গেলও ঘুষ লেনদেনের পক্ষে কোনো সরকারি নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য কিংবা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগ উত্থাপনকারী সোশ্যাল মিডিয়া অথবা ইউটিউব প্রতিবেদনে অর্থ লেনদেনের সমর্থনে সংলগ্ন কোনো যাচাইযোগ্য নথিও প্রদর্শিত হয়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে অভিযোগটি সত্য নয় বা মিথ্যা, এর সত্যতা নির্ধারণ করবে চলমান তদন্ত।
আরও পড়ুন: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে এক জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৪৬
অভিযোগ তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। গত ২১ জুলাই স্মারক ১৭,০০,০০০০.০৮৩.২৭.০০৬৩.২৬-৬০৮ এ উপসচিব (শৃঙ্খলা) সালাহউদ্দীন আহমদের স্বাক্ষরিত আদেশে যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) ডিএম আতিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয় এবং পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন কর্মী নিয়োগে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নথিপত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, মূল্যায়ন কমিটি, বিপিপিএ এবং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পৃথক ভূমিকা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কেবল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত কি শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অভিযুক্ত ভূমিকা সমানভাবে যাচাই করা হবে?
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত আউটসোর্সিং চালক ইসমাইল হোসেন জানিয়েছেন, তিনি ২০১৬ সাল থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যোগদানপত্র সংগ্রহ করেছেন এবং এ প্রক্রিয়ায় তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি বা কেউ টাকাও দাবি করেনি।
আরও পড়ুন: রাউজানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপটে সড়কে বাড়ছে ঝুঁকি ও দুর্ঘটনা
বোয়ালিয়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ফারুক হোসেন বলেছেন, তিনি ২০২৩ সালে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। ২০২৫ সালের নীতিমালায় অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান অনুযায়ী তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এ নিয়োগেও তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।
২০২৩ সালে যোগদানকৃত রাজপাড়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাব্বির হোসেনও একই রকম মন্তব্য করেছেন, বলছেন যে নতুন কাউকে নিয়োগ না দিয়ে পুরাতন কর্মীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর ক্ষেত্রেও কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি।
কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসাইন বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা এবং কেন্দ্রীয় অনুমোদনের ভিত্তিতে আগের কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে কোনো তালিকা তৈরি করেনি; বরং নির্বাচন কমিশনের থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুসারে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের অগোচরে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নিয়ে থাকলে তার দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেছেন, সরকার নির্ধারিত নীতিমালা ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই পুরো নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। তাঁর দাবি, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটেনি।
আরও পড়ুন: ভোলায় গোসল করতে গিয়ে পুকুরে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডিএম আতিকুর রহমান বলেছেন, তদন্ত না করে কোনো মন্তব্য করা যাবে না এবং বলেছেন যে তদন্ত চলমান রয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে তখন বিষয়টি জানানো সম্ভব হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রকৃতপক্ষে অনিয়ম হয়েছে কি না, ঘুষের অভিযোগের বাস্তবতা কী, আর যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সে দায় কার? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলে তদন্ত প্রতিবেদনে। তবে সরকারি নথিতে যখন দেখা যাচ্ছে পুরো প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয় নির্দেশনা, বিপিপিএর অনুমোদন, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং সচিবালয়ের স্বাক্ষরিত অনুমোদনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে, তখন অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন হলো, বহুস্তরের সিদ্ধান্তে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক দায় কি কেবল একজন কর্মকর্তার ওপরই বর্তাবে, নাকি তদন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তর সমানভাবে মূল্যায়িত হবে?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন