১১:১৬ পি.এম
মোস্ট ওয়ান্টেড ‘সাইকো কিলার’ ও আন্তঃজেলা সিরিয়াল অপরাধী গোলাম মোর্শেদ ওরফে মোর্শেদ আলমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় পুলিশ নওগাঁ জেলা থেকে একটি চৌকস দল গঠন করে গাজীপুরের বাসন থানা এলাকা থেকে তাকে আটক করে।
বুধবার (১০ জুন) ভোরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার বাসন থানাধীন শরীফপুর কোনাপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই সিরিয়াল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার গোলাম মোর্শেদের পৈতৃক গ্রামের নাম দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার পাতহাট। তিনি হইবর রহমানের ছেলে এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরে অন্তত ১৭-১৮ জন নারীর ওপর নৃশংস হামলার কথা স্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, তাদের মধ্যে তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
আরও পড়ুন: ‘বসন্তের কোকিল’ হিসেবে পরিচিত কাজী জাহিদ অভি? পূজামণ্ডপে অনুদান, ক্যানসার আক্রান্ত হাফেজকে সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশ জানায়, মোর্শেদের অপরাধ সংঘটনের ধরন ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও সাইকোপ্যাথিক। সে মূলত গভীর রাতে (রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে) একা থাকা বা নারীপ্রধান বাড়িগুলোকে টার্গেট করত। পরে সে দেয়াল টপকে বা জানালা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত নারীদের কপাল ও মাথায় টিউবওয়েলের হাতল, লোহার শাবল বা বাঁশ দিয়ে সজোরে আঘাত করে পালিয়ে যেত। যদিও চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্য থাকলেও নারীদের মাথায় গুরুতর আঘাত করাই ছিল তার অপরাধের মূল প্যাটার্ন।
১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ধামইরহাট উপজেলার নানাইচ ও জাহানপুর গ্রামে তিনটি বাড়িতে হামলা চালায় মোর্শেদ। হামলার ফলে, কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবার মাথায় টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে আঘাত করার কারণে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একই উপজেলার জাহানপুর গ্রামে শাহিন ইসলামের স্ত্রী সুলতানা বেগমসহ চারজনের ওপর বাঁশ ও টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে হামলা চালায়।
৭ মে ২০২৬ তারিখে বদলগাছি উপজেলার দুর্গাপুর, ঘোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকার তিনটি বাড়িতে দেয়াল টপকে ঢুকে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) এবং বাক্প্রতিবন্ধী বৃষ্টি (২০)-এর মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করে।
আরও পড়ুন: স্বাধীনতার পরও পাকা হয়নি সড়ক, দুর্ভোগে পাঁচ গ্রামের মানুষ
৪ জুন ২০২৬ তারিখে পত্নীতলা উপজেলার শিমুলিয়া ও নান্দাশ গ্রামে দুটি বাড়িতে জানালা ভেঙে ঢুকে রোজি আক্তার (৩৭), আলতা বানু (৪৫) ও আসমা খাতুন (২২)-এর মাথায় লোহার শাবল দিয়ে আঘাত করে জখম করে।
ধামইরহাট, বদলগাছি ও পত্নীতলায় একের পর এক একই ধরনের নৃশংস ঘটনার ফলে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং অপরাধীকে ধরতে একটি বিশেষ টিম গঠন করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জয়ব্রত পালের নেতৃত্বে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সাইবার ইউনিটের সদস্যরা ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেন। ঘটনাসমূহের সঙ্গতি বিশ্লেষণ করে জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলা থেকে একই ধরনের অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধীর মূল প্রোফাইল শনাক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর মোর্শেদকে নওগাঁ জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) কার্যালয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মোর্শেদ ধামইরহাটের কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবা হত্যার দায় স্বীকার করেছে। জানা গেছে যে, পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। বর্তমান সময়ে, তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: কেরানীগঞ্জে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ২৪ ঘণ্টা পাহারায় বিএনপির নেতাকর্মীরা
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, নওগাঁ জেলা পুলিশ অত্যন্ত নিবিড় ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সিরিয়াল অপরাধীর রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আরও জানান, মোর্শেদ নওগাঁয় চারটি ঘটনার পাশাপাশি দিনাজপুরে পাঁচটি এবং জয়পুরহাটে একটি ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে তার হামলায় আরও দুজন নারীর মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
তিনি আরও জানান, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং এ ধরনের জঘন্য অপরাধ নির্মূলে নওগাঁ জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমানে নওগাঁর বিভিন্ন থানায় এ-সংক্রান্ত হত্যাসহ মোট চারটি মামলা রুজু রয়েছে। দিনাজপুর ও জয়পুরহাট জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: কেরানীগঞ্জে জমি বিরোধে বসতবাড়িতে হামলা, টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন