১০:৪৭ পি.এম
ঢাকা, ৮ আগস্ট, ২০২৬ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে ইউএনওদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তারা নিজেদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বক্তব্য রেখে বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের জন্য মানুষের সেবা করার সুযোগ একটি বড় আমানত ও আল্লাহর নিয়ামত। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসহায়-দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যেতে হবে।’
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এক সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও বলেন, ‘আজ আমরা আছি, কাল থাকব না। আসুন আমরা সবাই মিলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করি, যেখানে সবাই একটু ভালো থাকবে।’
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের সঙ্গে সরকারের সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দায়িত্ব পালনরত উপজেলা হয়তো আপনার নিজের উপজেলা নয়; কিন্তু সেটি বাংলাদেশেরই একটি অংশ। সেখানে বসবাসকারী মানুষও নিজের এলাকার মানুষের মতোই আপন।’ তাই দেশের প্রতিটি মানুষকে নিজের মানুষ মনে করে কাজ করতে হবে।
আরও পড়ুন: ১৬৯০ ইবতেদায়ি শিক্ষকের অনুদান ছাড়ের দাবি জানাল শিক্ষক কল্যাণ কমিটি
এদিকে ইউএনওদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি যে উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন, সেটি হয়তো আপনার নিজের উপজেলা নয়। কিন্তু সেই উপজেলাতো আপনার দেশেরই একটা অংশ। সেখানে যে মানুষগুলোকে আপনি দেখছেন, তারা হয়ত আপনার এলাকার মানুষ নন; কিন্তু আপনার সেই আপনজনদের মতোই মানুষ। ছোট একটা দেশ, এই দেশটাকে যদি ঠিকঠাক করতে হয়, তাহলে আমাদের সবাইকে মিলেই চেষ্টা করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, আইন করে সমাজের সব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মানুষকে বুঝিয়ে ও সচেতন করে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। ইউএনওদের নিজ নিজ এলাকায় জনসচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন দূষণের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর তালিকায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এটিকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। এখন এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘উপজেলা ও পৌরসভাগুলোতে অনেক মানুষ নিজেদের উদ্যোগে গাছ রোপণ করতে চান। আপনাদের মতো সরকারি কর্মকর্তারা তাদের উৎসাহ দিলে একজন যেখানে ১০টি গাছ লাগাতেন, সেখানে ৫০টি গাছ লাগাতে পারেন। এভাবে আপনারা পরিবেশ রক্ষায় বড় ধরনের অবদান রাখতে পারেন।’
নতুনভাবে খেলাধুলার প্রসারেও ইউএনওদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনকে উৎসাহিত করলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলাবোধ তৈরি হয়।’
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগকে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করবে: মৎস্য প্রতিমন্ত্রী
তিনি আরও বলেন, ‘খেলাধুলার আয়োজনের জন্য শুধু বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় দিবসের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। স্থানীয়ভাবে ভালো যেকোনো বিষয় নিয়ে এমনকি স্থানীয় কোনো মানুষের জন্মদিন উপলক্ষেও খেলাধুলার আয়োজন করা যেতে পারে।’
সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে দয়া-মায়া কমে যাচ্ছে এবং মানুষ দিন দিন নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক চাপ এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
তবে, এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে সমাজের শান্তি নষ্ট হবে এবং সমাজ ধ্বংস হবে। তাই নিজ নিজ এলাকায় মানুষের প্রতি মানুষের দরদ ও সহমর্মিতা বাড়াতে আপনাদের উদ্যোগ নিতে হবে।
‘সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও ভাবতে হবে’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'শুধু মানুষের প্রতি নয়, আশপাশের পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতিও যত্নবান হতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে শিশুদের এসব বিষয়ে সচেতন করতে হবে। '
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁওয়ে উপনির্বাচনে দেলাওয়ার হোসেনের পক্ষে শ্রমিক সমাবেশ
তিনি আরও বলেন, 'এবার থেকে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিকতা এবং পশুপাখির প্রতি মায়া-মমতার বিষয়গুলো তাদের পাঠ্য হিসেবে যুক্ত করা হচ্ছে। '
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একসময় পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং পশুপাখির প্রতি মমত্ববোধের শিক্ষা দেওয়া হতো। বর্তমানে এসব মূল্যবোধ অনেকটাই অনুপস্থিত। এগুলো ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’
সভায় বিভিন্ন উপজেলায় খাল খনন প্রকল্পের কাজ সততার সঙ্গে সম্পন্ন করে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ায় ইউএনওদের প্রশংসা ও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আপনারা সরকার এবং জনগণের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাতে আমার বিশ্বাস, আপনারা জনগণের জন্য অনেক ভালো কিছুই করতে পারবেন।’
উপ-প্রেস সচিব জানান, সভায় ইউএনওরা নিজ নিজ উপজেলায় খাল খনন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর স্থানীয় কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও জনজীবনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা প্রধানমন্ত্রীকে জানায়।
আরও পড়ুন: ঢাকা থেকে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগারওয়াল গ্রেফতার
তারা জানান, খাল খননের আগে যেসব এলাকায় বছরে দুই ফসল হতো, সেখানে এখন তিন ফসল উৎপাদন হচ্ছে। খাল পুনঃখননের ফলে পানি নিষ্কাশন, সেচ ব্যবস্থা ও কৃষিকাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
যেমন ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার বার্তা উপকারভোগীদের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিল, তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন।
উপকারভোগীদের কৃতজ্ঞতার বার্তা গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল খননের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে-এর মাধ্যমে নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিত্র ফিরিয়ে আনা। কারণ, দিন দিন আমাদের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা পরবর্তীতে আমাদের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলবে। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি জানান, সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।
আরও পড়ুন: রাজনীতি মানুষের সেবায় হওয়া উচিত: ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল
উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
সভায় খাল খনন প্রকল্পে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া ৮৩টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সভায় উপস্থিত ছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন