০৪:২৪ পি.এম
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান বলেছেন, কর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে পারলে প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে আজ জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর অনুষ্ঠিত সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সততা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারা যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা আরো উৎসাহ নিয়ে কর দেবেন। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সময়ে সৎ করদাতারা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন, যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রাখা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বিদায়ী অর্থবছরে সাময়িক হিসেবে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
আরও পড়ুন: ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াবে প্রধানমন্ত্রীর আশা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সব খাতের জন্য ন্যায়সঙ্গত বরাদ্দ নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেছেন, 'যে বাজেট সমস্ত খাতকে সমান গুরুত্ব দেবে এবং সমাজের সব অংশীজনকে উপকৃত করবে, সেই বাজেটই একটি গ্রহণযোগ্য ও সফল বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে।'
তিনি উল্লেখ করেন, একটি বাজেট তখনই ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক হয়, যখন দেশের সমস্ত মানুষের অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়।
শিক্ষা খাতের বিষয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশে ইবতেদায়ি শিক্ষা সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষার সমমানের থাকা সত্ত্বেও এ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বাজেটে কোনো বরাদ্দ বা বিশেষ বিবেচনা রাখা হয়নি।
বিরোধী দলের নেতা আরো বলেন, শিক্ষা উন্নয়নের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবেই থেকে যাবে।
আরও পড়ুন: জয়-পুতুলসহ ৮ জনের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ আদালতের
বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ধরে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে, কিন্তু বাজেটে সেই অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।
তিনি বলেন, 'বাজেট ঘাটতি খুব বেশি নয়। পাচার হওয়া অর্থের মাত্র এক নবমাংশ উদ্ধার করতে পারলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চাই।'
পাহাড়ি ও অন্যান্য অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নে বাজেটে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব জনগণের অনেকেই এখনো যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে বঞ্চিত। তাদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা কমবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিদেশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনুকরণ না করে আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণাভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতি গঠন করতে হবে।
আরও পড়ুন: জামায়াতের নিন্দা, আইইডিসিআরের পরিচালকের ওপর হামলার তদন্তের দাবি
সরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধেও প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান। সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সেখানে অধ্যয়নরত প্রায় ৭৫০ জন শিক্ষার্থী ও নার্সের ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। তিনি মানবিকভাবে সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানান।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে ৮৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আদায় করছে একটি সিন্ডিকেট উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া গেলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান আরো বৃদ্ধি পাবে।
দুর্নীতিকে দেশের অন্যতম প্রধান বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি নির্মূল করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।
মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার কিছু মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। তবে এই সুবিধা অবশ্যই সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: গোলাম মোস্তফা: ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের সূচনা
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের কাজ হল বাজেটের দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরা। আলোচনা ও সমালোচনা মাধ্যমে বাজেটের গুণগতমান বাড়ানো সম্ভব।
তিনি আরও জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে বিরোধী দলের একটি কাট-মোশন গ্রহণ করা হয়নি। অন্তত একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে গণতন্ত্রের জন্য তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হত।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের বাজেটেও বিরোধী দলের যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো সরকার বিবেচনায় নেবে এবং অর্থমন্ত্রী এগুলো সংশোধনসহ সংসদে উপস্থাপন করবেন।
জনগণের সময়ের অপচয় কমানোর জন্য তিনি অর্থবছরকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে মিলিয়ে রাখার প্রস্তাব করেছেন। বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট বরাদ্দের ৪২ শতাংশ এবং শেষ দুই মাসে বাকি অর্থ ছাড় হওয়ায় দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
আরও পড়ুন: ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে এআই ক্যামেরার ব্যবস্থা
বক্তৃতার শুরুতে বিরোধী দলীয় নেতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী, মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন