১১:১৯ পি.এম
দেশে অভিবাসনের চাপ কমানোর লক্ষ্যে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সুইজারল্যান্ড নজিরবিহীন একটি প্রস্তাব নিয়ে গণভোটের আয়োজন করেছে। প্রস্তাবটি পাস হলে দেশের জনসংখ্যা আগামী কয়েক দশকে ১ কোটির মধ্যে সীমিত রাখতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যা ভবিষ্যতের অভিবাসন নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
এই গণভোট আগামী রবিবার অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সুইস নাগরিকরা সিদ্ধান্ত নেবেন, দেশের জনসংখ্যা ১ কোটির বেশি হতে দেওয়া হবে কি না। সুইজারল্যান্ডের সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নগুলো নিয়ে নিয়মিত গণভোটের আয়োজন করা হয়।
প্রস্তাবটির পক্ষে দেশের বৃহত্তম পার্লামেন্টারি দল ডানপন্থী ও জনতাবাদী সুইস পিপলস পার্টি রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ভোটের ফলাফল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে।
আরও পড়ুন: জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে চায় বাংলাদেশ
প্রস্তাবের সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমনে আবাসন, অবকাঠামো, সামাজিক সেবা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীবনযাত্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে।
অন্যদিকে, বিরোধীরা এমন উদ্যোগকে সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি ও শ্রম বাজারের জন্য ক্ষতিকর মনে করছেন। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, আর্থিক খাত ও ওষুধশিল্পে বিদেশি কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের ওপর দেশটির ব্যাপক নির্ভরশীলতা রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
ফেডারেল সরকার ও পার্লামেন্ট উভয়েই এই প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছে। ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইকোনোমিসুইস প্রস্তাবটিকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে যে, এটি দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সুইস পিপলস পার্টির আইনপ্রণেতা বার্নার্ড বাপস্ট দাবি করেছেন, উন্মুক্ত সীমান্ত নীতির কারণে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়েছে।
আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে আগাম ভোটগ্রহণ শুরু
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নাগরিকদের বসবাস ও কাজের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর দেশটির জনসংখ্যা ২৩ শতাংশ বেড়ে গত বছরের শেষে ৯১ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে অর্থনৈতিক উৎপাদনও ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তর সুইজারল্যান্ডের সেন্ট গ্যালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রেটো ফেলমি মন্তব্য করেছেন, “আমরা মূলত নিজেদের সাফল্যেরই শিকার।”
গণভোটে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সরকারকে ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ১ কোটির মধ্যে রাখতে ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছে যায়, তাহলে আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ, পরিবার পুনর্মিলন কর্মসূচি এবং আবাসিক অনুমতিপত্রের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচলসংক্রান্ত চুক্তিও বাতিল হলে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকবে। তবে জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক রেনে শভোকের মতে, এটি পাস হলে ব্রাসেলসের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার।
আরও পড়ুন: জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। এই ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান বিশ্বের শীর্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে; শুধু লুক্সেমবার্গ এবং অস্ট্রেলিয়া এর ওপরে রয়েছে।
অভিবাসন বিষয়টি ইউরোপের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘকাল ধরে রয়েছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য ও বিদেশি বিরোধী মনোভাব— এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে বহু দেশ। সুইজারল্যান্ডেও গত কয়েক দশক ধরে এ ইস্যু নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলমান রয়েছে।
এর আগে ২০১৪ সালে ‘অতিরিক্ত অভিবাসনের বিরুদ্ধে’ শীর্ষক একটি গণভোট অল্প ব্যবধানে পাস হয়েছিল। জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ফিলিপ ভ্যানারের মতে, গণভোটের মাধ্যমে কোনো দেশের জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের এমন উদ্যোগ বিশ্বে প্রায় নজিরবিহীন।
অন্যদিকে নিউশাতেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ এতিয়েন পিগের মন্তব্য করেছেন, অনেক দেশই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করে, তবে সুইজারল্যান্ডে এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বহু দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন: ইরানে কূটনৈতিক তৎপরতার জোয়ার: যুদ্ধ এড়াতে একজোট মুসলিম পরাশক্তিগুলো
সহস্রাব্দের শুরুতে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব আরও প্রবল হওয়ার সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আদলফ ওগি বলেছিলেন, বিদেশিরা আমাদের অর্থনীতি চালায়। পর্যটন খাতের জন্য শ্রমিকের প্রয়োজন, আর সুইজারল্যান্ডের জন্য মেধাবী মানুষেরও প্রয়োজন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন