মঙ্গলবার, ২০ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৯:৫০ এম
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে পশ্চিমা সমর্থিত ‘সরকারি বাহিনীর’ একটি সামরিক প্রশিক্ষণশিবিরে ইরান সমর্থিত হুথি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২০০ জন।
সোমবার, দেশটির শাবওয়া প্রদেশের আল-আলম সামরিক শিবিরে এ হামলা সংঘটিত হয়। সেখানে নতুন নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছিল।
বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পশ্চিমা সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সোমবার প্রশিক্ষণ চলাকালে শিবিরটিতে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান সমর্থিত হুথি বাহিনী। হামলার পর, পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা এবং চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো প্রথমে ১৮ জন নিহত ও ৩০ জনের বেশি আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছিল। পরে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ জন নিহত ও ২০০ জন আহত।
সংঘাতের তীব্রতা বাড়ছে
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা কমে এসেছিল। তবে চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব নতুন করে সংঘাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলে সরকারি বাহিনীর অনুগত সেনাদের কাছ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখল করে নেয় হুথিরা। এরপর সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত হুথি বাহিনীর নামের আরবি অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’।
হুথিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট পশ্চিমা সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে। পরে তারা ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে একটি অভিযান চালু করে। এর লক্ষ্য হুথিদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধার করা। এসব এলাকার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে। ২০১৪ সালে রাজধানীটি দখল করে নেয় ইরান সমর্থিত হুথি বাহিনী।
এদিকে সৌদি আরবের ওপরও হামলা বাড়িয়েছে হুথিরা। তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনাও রয়েছে।
সোমবার সৌদি কর্তৃপক্ষ রাজধানী রিয়াদের বাসিন্দাদের মোবাইলফোনে সতর্কবার্তা পাঠায়। এতে ‘শত্রুপক্ষের আকাশপথে হামলার হুমকি’ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।
নতুন নিয়োগ পাওয়া সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি জানান, শাবওয়ায় নিহত ব্যক্তিরা নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্য ছিলেন। এ হামলার জবাবে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
আল-আলিমি বলেন, ‘নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বোঝা যায়, চাপের মুখে পড়লে হুথি মিলিশিয়া সন্ত্রাসী হামলার পথ বেছে নেয়।’
সানা থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি জানান, হুথিরা এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে, সৌদি আরব-সমর্থিত একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলাটি চালানো হয়েছে। ওই ঘাঁটিতে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী অবস্থান করছিল।
ইউসুফ মাওরি বলেন, হুথিরা জানিয়েছে, তারা এ ধরনের ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রাখবে। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি আরব-সমর্থিত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে—এমন যেকোনো স্থানকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এর আগে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছিল, তারা তাইজ শহরের দক্ষিণে আল-আকরৌদ, আল-শাকাব ও আল-সারারি এলাকায় হুথিদের সমাবেশ, যানবাহন ও অস্ত্রের ওপর হামলা চালিয়েছে। জ্বালানির সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে ভুগছে তাইজ শহর।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ফ্রান্সজুড়ে সহিংস দাঙ্গার ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে প্রকাশ করছে। সরকারের চাপের মুখে পড়ার পর, কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদহানি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তরুণদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং দুর্বল অর্থনীতির কারণে দেশটি অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সোমবার বলেন, ‘খোলাখুলি বলতে গেলে, আমরা এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি।’ তবে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে তাঁর বক্তব্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করা হচ্ছে। সপ্তাহান্তের দাঙ্গায় দেশটির বড় শহরগুলোতে ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পুলিশের ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্যারিস, মার্সেই, বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। দুই বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা সামলে টিকে থাকা লিমোজ শহরের সিটি হলও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটির ঘড়ি-টাওয়ারের চূড়া ধসে পড়েছে।
সপ্তাহান্তের সহিংসতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল। জরাজীর্ণ স্কুল, শিক্ষকের ঘাটতি এবং চাকরির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এসব বিক্ষোভে অংশ নেন। ওই আন্দোলনে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শতাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আগামী সপ্তাহান্তেও নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। নভেম্বরে ধর্মঘটের পরিকল্পনা করছে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। ফলে, আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রান্সে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থি প্রার্থী মেরিন লো পেন এগিয়ে রয়েছেন।
রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বাড়ছে বিভাজন
রোববার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সহিংসতার নিন্দা করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি তিনি। বরং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সতর্ক করেন। এরপর তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোতে তিন দিনের সফরে ফ্রান্স ছাড়েন।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুও বিরোধীদের ওপর দায় চাপিয়েছেন। উগ্র বামপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশো সরকারের পুলিশি কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, সরকারই ‘বিশৃঙ্খলার দরজা খুলে দিয়েছে’। এর জবাবে লেকর্নু বলেন, ‘সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে যারা সহিংসতা চালাচ্ছে, তাদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যায় না। এটি আপনাদের রাজনৈতিক দায়।’
উগ্রডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের প্রার্থী মেরিন লো পেন এ পরিস্থিতিতে অভিবাসন ইস্যু সামনে এনেছেন। তিনি সহিংসতার জন্য ফ্রান্সের দরিদ্র শহরতলি এলাকার অপরাধপ্রবণ তরুণদের দায়ী করেন। এসব এলাকায় দেশের অভিবাসী জনগণের বড় একটি অংশ বসবাস করে।
লো পেন বলেন, ‘আমাদের দেশ সহিংসতা ও অসহায়ত্বের এক চক্রে আটকে পড়েছে।’ তিনি মাখোঁর আমলের বিশৃঙ্খলার মধ্যে কেবল তাঁর কঠোর অবস্থানই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে বলে ইঙ্গিত দেন।
ন্যাশনাল র্যালি দলের সভাপতি জর্ডান বারদেলাও পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ‘অ্যান্টিফা মিলিশিয়া, উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীকে’ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন। ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীর সদস্যরা বিক্ষোভের সময় পরিচয় গোপন রাখতে সাধারণত একই ধরনের কালো পোশাক ও মুখোশ পরেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের রাজনৈতিক বিভাজন দেশটির সংকটকে আরও গভীর করছে। ২০২৪ সালে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন মাখোঁ। কিন্তু সেই নির্বাচন উল্টো পার্লামেন্টে অচলাবস্থা তৈরি করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ বিভাজন সহজে কাটবে না।
দেশটির রাজনৈতিক মধ্যপন্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে ন্যাশনাল র্যালি এবং মেলঁশোর উগ্র বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোড। জনসাধারণের ক্ষোভকে পুঁজি করে দল দুটি সমর্থন বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, মাখোঁর একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে বাজেট পাস করাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের আধুনিক ফরাসি ইতিহাসের অধ্যাপক রবার্ট জারেটস্কি আটলান্টিক সাময়িকীতে এক নিবন্ধে লিখেছেন, মধ্যপন্থি প্রার্থীদের সংখ্যা বেশি এবং তাঁদের বেশির ভাগেরই সমর্থক তুলনামূলক কম। শেষ পর্যন্ত এতে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে এমন দুই প্রার্থীর একজনের জয়ের পথ তৈরি হতে পারে, যাঁদের ফ্রান্সের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সরকারি ঋণ ও অর্থনৈতিক পতনের শঙ্কা
বর্তমান সংকট ফ্রান্সের আগে থেকেই বিভক্ত সমাজকে আরও মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সপ্তাহান্তের সহিংসতায় ক্ষোভ ও হতাশার পাশাপাশি দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের নেতিবাচক মনোভাবও বাড়ছে।
সম্প্রতি ইপসোস-বিভিএর এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৮৫ শতাংশ মনে করেন, ফ্রান্সের অবনতি হচ্ছে। আর ৯৮ শতাংশই দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।
পরবর্তী সরকার যে দলই গঠন করুক, স্থিতিশীল জোট গঠন করতে পারলেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাদের হাতে বিকল্প কম থাকবে।
ফ্রান্সের অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্মে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে।
পর্যটন এখনো ফ্রান্সের আয়ের অন্যতম বড় উৎস। তবে গত দুই দিনে দেশটির রাস্তায় সহিংসতার যেসব ভিডিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। সুদের হার বাড়ার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সরকারি ঋণ নিয়ে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গবেষকেরা জুলাইয়ে বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণের বোঝা অন্যতম বেশি। রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দেশটির ঋণ আরও বাড়বে বলে আমরা মনে করছি।’
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছর মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে রেকর্ড ৩৪ হাজার কোটি ইউরো ঋণ নিতে হবে ফ্রান্সকে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত বেড়ে ১১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ হার দ্বিগুণ।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বেড়েছে। সোমবার ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়।
মেলঁশোর একটি প্রস্তাবও বন্ডবাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তিনি ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা দেশটির সরকারি বন্ডের সুদ স্থগিত করা বা সেগুলোর ঋণ বাতিলের পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের মতে, ২০২৭ সালের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও রাজনৈতিক বিভাজন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পরবর্তী সরকার সরকারি অর্থব্যবস্থার সমস্যাগুলো সমাধান না করে বারবার পিছিয়ে দিতে পারে। এতে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ম্যাক্রোঁর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব
ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বদের একজন জেনারেল শার্ল দ্য গল একবার বলেছিলেন, ‘মহত্ত্ব ছাড়া ফ্রান্স, ফ্রান্স হতে পারে না।’
দেশের আন্তর্জাতিক ভূমিকা ও স্বাধীনতা নিয়ে তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল।
তবে দীর্ঘ প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এক সহযোগীকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যত দিন পারি, মঞ্চের নাটক চালিয়ে যাব। এরপর কী হবে, সে বিষয়ে কোনো ভ্রমে থেকো না। সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে।’
১৯৬৮ সালের দাঙ্গার এক বছর পর পদত্যাগ করেছিলেন দ্য গল। ওই দাঙ্গায় ফ্রান্স কেঁপে উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের ঘটনার তুলনা টানছেন কিছু বিশ্লেষক।
ম্যাক্রোঁ প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় তাকে ফ্রান্সের অবনতি নিয়ে প্রচলিত হতাশাবাদী ধারণার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। ফরাসি ভাষায় এ ধারণাকে বলা হয় ‘দেক্লিনিসম’। ২০১৬ সালে প্রকাশিত লারুস অভিধানেও শব্দটি স্থান পেয়েছে।
তখন এক ভাষ্যকার লিখেছিলেন, ম্যাক্রোঁ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ও গঠনমূলক বার্তা দেন। তার বক্তব্যে এমন এক ফ্রান্সের ছবি উঠে আসে, যেখানে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু এক দশক পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী, ম্যাক্রোঁর প্রতি সমর্থন এখন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে সংকটে জর্জরিত রাষ্ট্রের কাছে আরো বেশি প্রত্যাশা করছে সাধারণ মানুষ, যদিও সেই প্রত্যাশা পূরণের সামর্থ্য সরকারের ক্রমেই কমছে। ফ্রান্সের অবনতি নিয়ে হতাশাবাদী ধারণাও জনপরিসরে জোরালোভাবে ফিরে এসেছে।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ফ্রান্সে টানা বিক্ষোভ, সংঘর্ষ এবং দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনার পর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশটির কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ এবং সমাবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে রাতের চলাচল সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্ন্যু জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ে কারফিউ আরোপ করা হবে। তবে প্যারিসজুড়ে সর্বাত্মক কারফিউ আরোপের পক্ষে নয় সরকার। বরং সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা বেশি ঘটে এমন এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিধিনিষেধ আরোপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপুবলিক এবং লে আল এলাকার কিছু অংশে রাতের কারফিউ এবং নির্দিষ্ট সময় থেকে বিক্ষোভ-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে লিল ও নিসসহ অন্যান্য শহরের কিছু এলাকায়ও রাতের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে শহরভেদে এসব ব্যবস্থার সময়সীমা ও শর্ত আলাদা।
গত সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের একপর্যায়ে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহায়তা এবং অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও কাজ করছে সরকার।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহের সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এসব ঘটনায় হতাহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং আর্থিক ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নির্ধারণের কাজ চলছে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি এবং কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি; বরং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জননিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বিক্ষোভের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তোষের বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সরকারি কর্মচারীরা নতুন পে স্কেল অনুযায়ী আইবাস++ ব্যবস্থার ‘পে ফিক্সেশন’ অপশনে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করছেন। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়সীমা মঙ্গলবারের (২০ অক্টোবর) মধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। পে ফিক্সেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল গত ৫ অক্টোবর।
অর্থ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, মূল বেতন নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন হলে অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধের সময় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হবে।
এদিকে, সরকারি চাকরিজীবীরা চলতি অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর অধীনে বাড়তি মূল বেতন এবং বকেয়া অর্থ গ্রহণ করবেন। তবে, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা আপাতত বাড়ানো হচ্ছে না। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এসব ভাতা ২০২৬ সালের ৩০ জুনে আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে প্রদান করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গতকাল সোমবার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বের ভিত্তি বজায় রাখা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি ‘পে ফিক্সেশন’ নামে পরিচিত। আইবাস++ পে ফিক্সেশন মডিউলে নতুন বেতন নির্ধারিত হবে। চাকরিজীবীরা এই পোর্টালে প্রবেশ করে তাদের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য প্রদান করবেন। প্রথমে তাদের পরিচয় প্রদান করতে হবে, যার মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং বর্তমান মূল বেতন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পূর্বের বেতন নির্ধারণের তথ্যও মিলিয়ে দেখতে হবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী কার মূল বেতন কত হবে, তা বেতন নির্ধারণের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
আগের মূল বেতন এবং নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের মধ্যে পার্থক্য, চাকরিজীবীর পদবি, গ্রেড এবং নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখের ভিত্তিতে বকেয়ার পরিমাণ হিসাব করা হবে।
অর্থ বিভাগের সূত্র বলছে, নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বকেয়া বা এরিয়ার বাবদ তিন মাসের টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করবে সরকার। তবে, প্রতিটি গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনর্নির্ধারিত বেতন এবং বেতন কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখের ভিত্তিতে ব্যক্তিভেদে এই বকেয়ার পরিমাণ ভিন্ন হবে।
যদি কারো পদোন্নতি, বদলি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে সেসব তথ্যও প্রদান করতে হবে। এসব তথ্যের পক্ষে থাকা অফিস আদেশ ও প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখতে হবে।
বিশেষভাবে নাম, এনআইডি, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে বেতন নির্ধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই আইবাস++ এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের প্রয়োজন হবে। এর পাশাপাশি এনআইডি চাকরির নথিতে থাকা জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করে আবেদন করতে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
নেত্রকোনার পূর্বধলায় চায়ের দোকানে কর্মচারী ছাড়াই ক্রেতার কাছে চা পৌঁছে দিচ্ছে কাঠের তৈরি বিশেষ ক্রেন। কোনো মানুষের হাতের স্পর্শ ছাড়াই তারের টানে এক বেঞ্চ থেকে অন্য বেঞ্চে পৌঁছে যাচ্ছে চায়ের কাপ। ব্যতিক্রমী এই যান্ত্রিক কৌশল তৈরি করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন ৫২ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি ও চা-বিক্রেতা মো. হাতেম আলী।
উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নের বারহা বোর্ডবাজারে শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের পাশে তার চায়ের দোকান। প্রতিদিনই তার তৈরি এই কাঠের ক্রেন দেখতে ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ।
অভাব থেকেই উদ্ভাবন
হাতেম আলী জানান, চায়ের দোকানে একজন কর্মচারী রাখলে বেতন ও খাওয়াসহ মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হতো। আর্থিক সংকটের কারণে কর্মচারী ছাড়াই দোকান পরিচালনার বিকল্প ভাবতে শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে কাঠ, তার ও কয়েকটি বিয়ারিং দিয়ে নিজ হাতে তৈরি করেন বিশেষ এই ক্রেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।
বর্তমানে দোকানে বসেই কাঠের হাতল ঘুরিয়ে ক্রেনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে চা, বিস্কুট ও অন্যান্য পণ্য পৌঁছে দেন তিনি। একই ব্যবস্থায় ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকাও সংগ্রহ করেন।
আগেও দেখিয়েছেন কারিগরি দক্ষতা
হাতেম আলীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। তবে কাঠমিস্ত্রি হিসেবে প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেছেন নানা ব্যতিক্রমী জিনিস। প্রায় ৩০ বছর আগে রেললাইনে মালামাল পরিবহনের জন্য বিয়ারিং ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের একটি যান তৈরি করেছিলেন তিনি। কাঠ দিয়ে মানবমূর্তি তৈরিতেও রয়েছে তার দক্ষতা।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল মিয়া বলেন, ব্যতিক্রমী কিছু করার আগ্রহ হাতেম আলীর দীর্ঘদিনের। তার এই উদ্ভাবন সেই সৃষ্টিশীলতারই আরেকটি উদাহরণ।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান জানান, অনেকে শুধু চা পান করতে নয়, তার তৈরি যন্ত্রটি দেখতেও দোকানে আসেন।
জারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও হাতেম আলী অত্যন্ত সৃষ্টিশীল একজন মানুষ। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তার মতো মানুষের মেধা আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব।
সামান্য অর্থ ব্যয়ে তৈরি কাঠের ক্রেন দিয়ে কর্মচারী ছাড়াই চায়ের দোকান পরিচালনা করছেন হাতেম আলী। তার এই উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে যেমন কৌতূহল তৈরি করেছে, তেমনি গ্রামীণ পর্যায়ে উদ্ভাবনী চিন্তা ও কারিগরি দক্ষতার সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ