০১:১৯ এম
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে উত্তেজনা দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান, এবং এর পিছনের ইতিহাসও যথেষ্ট জটিল। সম্প্রতি দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনে এই অঞ্চল সম্পর্কিত বিরোধ নিষ্পত্তিতে মানচিত্র, প্রাচীন কম্পাস এবং ইতিহাসের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পেয়েছে। মূলত, এই বিরোধটি বর্তমান সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শিকড় ইতিহাসের প্রমাণে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের প্রায় এক দশক হয়ে যাওয়ার পরও দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধে কোনও স্থায়ী সমাধান আসেনি। হেগের সালিশি আদালত পূর্বেই পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, বিতর্কিত জলসীমায় চীনের ঐতিহাসিক অধিকারের কোনও আইনি ভিত্তি নেই। তা সত্ত্বেও, অঞ্চলটির বিভিন্ন দাবিদার দেশগুলো নিজেদের পক্ষে জনমত ও ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চীন এখানে নিজেদের পক্ষে শক্তিশালী ঐতিহাসিক ন্যারেটিভ তৈরি করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশটির বহু জাদুঘর এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত স্কুলগুলোর পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন সময় থেকেই এই সমুদ্রের ওপর চীনের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের কথা প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি, প্রাচীন রাজবংশের আমল থেকে এই অঞ্চলে চীনা মৎস্যজীবীদের নিয়মিত যাতায়াতের তথ্য তুলে ধরে নিজেদের ঐতিহাসিক অধিকারের দাবি আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ‘বর্তমান নিয়ন্ত্রণরেখায় যুদ্ধ স্থগিতে সম্মত ইউক্রেন’
অন্যদিকে, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের মতো অন্যান্য দাবিদার দেশের কৌশল ভিন্ন। ফিলিপাইন সাধারণত সমুদ্রপথে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে, যার মাধ্যমে তারা বিতর্কিত অঞ্চলে চীনের যেকোনো আক্রমণাত্মক বা জোরপূর্বক কার্যকলাপকে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করে। অপরদিকে, ভিয়েতনাম প্রকাশ্যে সংঘর্ষে না গিয়ে নীরব কূটনীতি এবং চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
এই বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো কাদের আগে এই অঞ্চলে উপস্থিত হওয়ার প্রমাণ। চীন প্রাচীন সময়ের বিভিন্ন মানচিত্র, কম্পাস ব্যবহারের তথ্য এবং রাজকীয় নথিপত্রকে নিজেদের পক্ষে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের দাবি, শত শত বছর আগে থেকেই তাদের পূর্বপুরুষরা এই জলপথ এবং এর দ্বীপগুলো আবিষ্কার করেছেন এবং সেখানে নিয়মিতভাবে যাতায়াত করতেন।
তবে অন্যান্য ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই দাবির বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তাদের মতে, প্রাচীন মানচিত্র বা কম্পাসের ব্যবহার আধুনিক সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান মাপকাঠি হতে পারে না। জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইন কনভেনশন অনুযায়ী আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর যে একচ্ছত্র বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা জলসীমার অধিকার রয়েছে, সেটির সাথে প্রাচীন ঐতিহাসিক উপকথা বা দাবির সবসময় মিল থাকে না।
এমন অবস্থায়, দক্ষিণ চীন সাগরের এই দ্বীপ এবং জলপথগুলো কৌশলগত এবং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, দেশগুলো সহজে পিছু হঠছে না। সাগরের তলদেশে আছে তেল, গ্যাস, সহ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, এবং এর উপর দিয়ে বিশ্বের একটি বৃহৎ অংশের বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া যায়। ফলস্বরূপ, অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে প্রতিটি পক্ষই নিজেদের ঐতিহাসিক দলিল ও মানচিত্রসমূহকে সঠিক হিসেবে প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর তুরস্কের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ চীন সাগরের এই সংঘাত কেবল আধুনিক যুদ্ধজাহাজ বা সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং এটি এখন এক ঐতিহাসিক ন্যারেটিভ ও মানচিত্রের লড়াইতে পরিণত হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক প্রচারণার চেয়ে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বেশি অগ্রাধিকার না দেবে, ততদিন এই জটিল ভূরাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান আসা অত্যন্ত কঠিন বলেই বিশ্লেষকদের ধারনা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন