০৪:৫৯ পি.এম
ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনামলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনা অত্যন্ত বিরল হিসেবে বিবেচিত। এর পূর্বে কেবল একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যৌন অসদাচরণের অভিযোগে পদ ছাড়তে বাধ্য হন।
এমন পরিস্থিতিতে গত শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং ভারতের তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি একটি প্রতীকী রাজনৈতিক বিজয়ে পরিণত হয়েছে।
দেশজুড়ে চলা ছাত্র-যুব আন্দোলনের চাপের কারণে তার পদত্যাগকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে অনেকেই মনে করেন।
আরও পড়ুন: ইউরোপে উগ্রপন্থার উত্থান, মধ্যপন্থি রাজনীতির জনসমর্থন দুর্বল হচ্ছে
দিল্লির ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকর্মী সাখি মনে করছেন, “এই প্রথম মনে হলো, প্রতিবাদের মাধ্যমে আমরা সত্যিই কিছু পরিবর্তন আনতে পারি।”
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় মোদি সরকারের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর পুরোনো একটি বক্তব্য। সেটিতে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সরকারে কেউ পদত্যাগ করে না।”
এই ভিডিওটি নতুন করে আলোচনায় আসে এবং আন্দোলনকারীরা এটিকে সরকারের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা শেষ পর্যন্ত জনচাপের মুখে ভেঙে পড়েছে।
সাখির বক্তব্যে উঠে আসে যে, তারা ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইয়ে গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের গুরুত্ব সম্পর্কে পড়েছেন, কিন্তু মোদি সরকারের সময়ে বাস্তবে সেই পরিবেশের অভাব অনুভব করেছেন।
আরও পড়ুন: হত্যাচেষ্টা মামলায় দিলীপ আগারওয়ালাকে গ্রেপ্তারসহ ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন
আন্দোলনের সময় তিনি ইনস্টাগ্রামে পুলিশের লাঠিচার্জ, আটক ও নির্যাতনের ভিডিও পোস্ট করেন। সেইসঙ্গে পুলিশকে ব্যঙ্গ করে তৈরি বিভিন্ন রিলও প্রকাশ করেন। এসব ভিডিও কয়েক মিলিয়ন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
তার মতে, সরকার আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি বুঝতে পারেনি। কারণ, তারা মূলধারার গণমাধ্যম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
কীভাবে শুরু হয় আন্দোলন? গত মে মাসে ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা এনইইটি’র প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে পরীক্ষা বাতিল হয়। এই ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হয়।
এই ঘটনার ফলে মানসিক চাপের কারণে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা।
আরও পড়ুন: মাদক নির্মূলে সংগঠন গড়তে চান ইশরাক হোসেন
এই ক্ষোভকে সংগঠিত করে ব্যঙ্গধর্মী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)। ভারতের প্রধান বিচারপতি এক মন্তব্যে ভুয়া ডিগ্রিধারী বেকারদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে তুলনা করার পর এই প্রচারণা শুরু হয়।
সংগঠনটি দিল্লিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানায়।
প্রথমদিকে আন্দোলনটি খুব বেশি সাড়া পায়নি তবে ১৮ জুলাই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
সেদিন অনশনরত শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক সরিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় অপরিশোধিত তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে
এর দুদিন পর সিজেপির আহ্বানে কয়েক হাজার মানুষ সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও পেলেট গান ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। কিন্তু দমন-পীড়নের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং উল্টো আন্দোলনে আরও বেশি মানুষ যোগ দেয়।
দিল্লি থেকে আন্দোলনটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মুম্বাইয়ের আন্দোলনকর্মী সোমায়া কর্দে জনগণকে অনলাইনে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানোর জন্য পুলিশ তাকে আটক করেছিল। তবে পরবর্তী কয়েক দিনে তিনি একাধিক বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন।
২৬ বছর বয়সী এই আইনজীবী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ শেষ নয়, এটি কেবল শুরু।”
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকের জন্য এটিই প্রথম বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ। তথাপি শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্যসহ আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে রয়েছে।
আরও পড়ুন: মিষ্টির পর ইশরাকের পদত্যাগ: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নাকি দল সামলানোর চেষ্টা?
সোমায়া কর্দে এমন একটি সম্প্রদায় থেকে উঠে এসেছেন, যাদের ভারত সরকার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তাঁর বিশ্বাস ছিল, উচ্চশিক্ষাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়।
তিনি মন্তব্য করেন, “বিদ্যালয় ও কলেজ বেসরকারিকরণ হচ্ছে, বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, পড়াশোনা শেষ করলেও পর্যাপ্ত চাকরি নেই। গণতন্ত্রে এসব বিষয়ে সরকারের জবাবদিহি থাকা উচিত।”
ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুব জনগোষ্ঠী থাকলেও সরকারি তথ্যানুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি জুনে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন: গোয়েন্দা সংস্থাকে বিরোধী দলের পেছনে লাগানো বিপজ্জনক: হাসনাত আবদুল্লাহ
এমনকি উচ্চশিক্ষিত তরুণদেরও অবস্থা উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, চাকরি খোঁজা স্নাতকদের মধ্যে এক বছরের মধ্যে স্থায়ী বেতনের চাকরি পান ৭ শতাংশেরও কম। আর সাদা-কলার বা অফিসভিত্তিক চাকরি পান ৪ শতাংশেরও কম।
১৮ বছর বয়সী হর্ষবর্ধন কদম বাবার মৃত্যুর পর মাকে সহায়তা করার জন্য স্কুল শেষ করেই খণ্ডকালীন ল্যাপটপ বিক্রির কাজ শুরু করেন।
২৩ জুলাই মুম্বাইয়ের এক বিক্ষোভে পুলিশ তাকে আটক করার সময় ধারণ করা একটি ভিডিও ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্য তাকে মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন। পরে ওই কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
তবে কদম জানান, “আমি চাইনি ওই পুলিশ সদস্য বরখাস্ত হোক। আমি শুধুমাত্র দেখাতে চেয়েছিলাম, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে পুলিশ আমাদের সঙ্গে কী আচরণ করছে।”
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “এটি কেবল শুরু। এবার সরকার বুঝেছে, মানুষ একসঙ্গে কণ্ঠ তুললে তাদেরও ভয় পেতে হয়।”
গুয়াহাটির ২৯ বছর বয়সী চিত্রনাট্যকার স্বরাজ প্রিয় মনে করেন, দীর্ঘদিন আন্দোলন করেও কোনও পরিবর্তন না হওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এই আন্দোলন তাঁকে নতুন আশাবাদী করেছে।
তার ভাষায়, “এই আন্দোলন প্রশ্ন করার এবং ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা আবার ফিরিয়ে এনেছে।”
দেশজুড়ে আন্দোলনের বিভিন্ন স্থানে এখন প্রকাশ্য একটি স্লোগান দেখা যাচ্ছে- “ধর্মেন্দ্র প্রধান কেবল উদাহরণ, এবার মোদির পালা।”
কিন্তু আশাবাদের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের মধ্যে উদ্বেগও বিদ্যমান। পাটনার ৩০ বছর বয়সী গবেষক ও ছাত্রনেত্রী বরুণী পূর্বা বিশ্বাস করেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রমাণ করে যে, জনআন্দোলনের মাধ্যমে মোদি সরকারকেও নতি স্বীকার করতে বাধ্য করা সম্ভব।
তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য গ্রেফতার এড়াতে তিনি আগাম জামিনের আবেদন করেছেন। পুলিশের দাবি, শতাধিক আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অজুহাতে মামলা দায়ের হয়েছে এবং ৪০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, মোদি সরকারের সময়ে ভারতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য-সংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার হয়েছে।
তবুও বরুণী পূর্বার বিশ্বাস, এই আন্দোলন ভারতের তরুণদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, “তরুণদের ক্ষোভের মূল কারণগুলো এখনও রয়ে গেছে। তাই সরকারের পক্ষে আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া সহজ হবে না।”
দিল্লির একটি আন্দোলনস্থলের দেয়ালে লেখা একটি স্লোগান যেন এই প্রজন্মের মনোভাবই তুলে ধরে- “আমাদের চাকরি নেই। এই লেখা মুছে ফেললেও আমরা আগামীকাল আবার ফিরে আসব।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন