০৩:৪০ পি.এম
১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে পালিত হয়। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক রোগের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে দিবসটি বিশ্বব্যাপী উদযাপন করা হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হলো— “Lived experience heard: Real voice, real change.” বাংলায় এর অর্থ হচ্ছে, “বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শুনুন: প্রকৃত কণ্ঠস্বরেই আসুক বাস্তব পরিবর্তন।” এই প্রতিপাদ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের কথা শুনতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্য দূর করতে হবে।
প্রবীণদের জন্য এই আহ্বান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের সমাজে প্রবীণদের শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে কিছু আলোচনা হলেও তাদের মানসিক স্বাস্থ্য অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে।
মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি
আরও পড়ুন: টঙ্গীতে গ্যাস লিকেজের বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৩ সদস্য দগ্ধ
বাংলাদেশে পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রায় ১২ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা থেকে বঞ্চিত। অনেকের ক্ষেত্রে আর্থিক অসচ্ছলতা, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক লজ্জা এর প্রধান কারণ।
মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ধরনও বিভিন্ন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা, নির্দিষ্ট বিষয় বা পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত ভয় এবং অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিজঅর্ডার বা শুচিবায়ুর মতো সমস্যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। অন্যদিকে, সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যায় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে। আলঝাইমার্স ও অন্যান্য ধরনের ডিমেনশিয়াও স্মৃতি, চিন্তা, আচরণ ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এসব সমস্যার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বয়স বাড়লেই কি মানসিক সমস্যা?
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, বয়স বাড়লে মানুষ ভুলে যায়, অকারণে রেগে যায়, সন্দেহপ্রবণ হয় কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করে। অনেকেই এসব পরিবর্তনকে বার্ধক্যের স্বাভাবিক পরিণতি বলে মনে করেন। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু পরিবর্তন ঘটলেও সব ধরনের স্মৃতিভ্রংশ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা আচরণগত পরিবর্তনকে স্বাভাবিক বার্ধক্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরও পড়ুন: হত্যাচেষ্টা মামলায় দিলীপ আগারওয়ালাকে গ্রেপ্তারসহ ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন
একজন প্রবীণ দীর্ঘদিন ধরে একাকিত্ব, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, শারীরিক অসুস্থতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা পরিবারের অবহেলার মধ্যে থাকলে তার মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবার ডিমেনশিয়া বা অন্য কোনো রোগের কারণেও আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাই প্রবীণের কথা মন দিয়ে শোনা, তার পরিবর্তিত আচরণের কারণ বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা পরিবারের দায়িত্ব।
হাসি-তামাশা নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের গ্রামগঞ্জে মানসিকভাবে অসুস্থ অনেক প্রবীণকে নিয়ে হাসি-তামাশা করা হয়। কেউ কেউ তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজিত করেন, কটূক্তি করেন কিংবা এমন আচরণ করেন, যাতে তারা রেগে গিয়ে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখান। এরপর সেই প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আরও উপহাস করা হয়। একজন অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে বিনোদনের উপকরণ বানানোর মধ্যে মানবিকতা নেই।
মানসিক অসুস্থতার কারণে কেউ কখনো অস্বাভাবিক কথা বলতে পারেন, একই কথা বারবার বলতে পারেন কিংবা আচরণে অসংলগ্নতা দেখাতে পারেন। তাই বলে তাকে অপমান করার অধিকার কারও নেই। বরং এমন আচরণের পেছনে কোনো অসুস্থতা, মানসিক চাপ কিংবা অসহায়ত্ব কাজ করছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
আরও পড়ুন: মাদক নির্মূলে সংগঠন গড়তে চান ইশরাক হোসেন
আরও কষ্টদায়ক হলো, কোনো ব্যক্তির মানসিক অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে তার সন্তান ও পরিবারের সদস্যদেরও ‘পাগলের ছেলে’, ‘পাগলের মেয়ে’ কিংবা ‘পাগলের বংশ’ বলে অপমান করা হয়। এ ধরনের ভাষা শুধু একজন অসুস্থ মানুষকে নয়, তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সামাজিকভাবে হেয় করে। মানসিক অসুস্থতা কোনো অপরাধ নয়, লজ্জার বিষয়ও নয়। এটি এমন একটি স্বাস্থ্যসমস্যা, যার জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা, পরিচর্যা ও সহমর্মিতা।
দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, অস্বাভাবিক ভয়, স্মৃতিশক্তির অবনতি কিংবা আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বাইপোলার ডিজঅর্ডারসহ অনেক মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
চিকিৎসকদেরও প্রবীণদের সমস্যাকে শুধু বয়সের ফল হিসেবে না দেখে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে এবং প্রবীণদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানসিক অসুস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে উপহাসের পরিবর্তে সহমর্মিতা দেখানোর শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া দরকার।
আরও পড়ুন: মিষ্টির পর ইশরাকের পদত্যাগ: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নাকি দল সামলানোর চেষ্টা?
প্রবীণদের কথা শুনুন
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অভিজ্ঞতা শোনা ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রবীণদেরও নিজেদের কষ্ট, ভয়, হতাশা ও প্রত্যাশার কথা বলার অধিকার রয়েছে। তাদের কথা মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া, অবজ্ঞা করা কিংবা সব সমস্যাকে বয়সের অজুহাতে উড়িয়ে দেওয়া চলবে না।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানসিকভাবে অসুস্থ প্রবীণকে অপমান নয়, সম্মান করা হবে; উপহাস নয়, সহমর্মিতা দেখানো হবে; অবহেলা নয়, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হবে। মনে রাখতে হবে, আজ যাঁকে আমরা দুর্বল বলে অবজ্ঞা করছি, তিনিও একদিন পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য অবদান রেখেছেন।
প্রবীণদের কথা শুনুন, তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করুন। মানসিক স্বাস্থ্য কোনো লজ্জা নয়, এটি মানুষের মৌলিক সুস্থতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। সামাজিক আচরণের পরিবর্তনেই প্রবীণদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আরও পড়ুন: গোয়েন্দা সংস্থাকে বিরোধী দলের পেছনে লাগানো বিপজ্জনক: হাসনাত আবদুল্লাহ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন