১২:১১ এম
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যমুনার অন্দরে ও কিনারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্নীতির তদন্ত পরিচালনা করার জন্য দুদককে নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সর্বাধিক দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছিল। এই বিষয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্রের রিপোর্টের ভিত্তিতে এটা সম্ভব হতে পারে। আজ রবিবার রাতে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
এছাড়া, অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনায় তিনি বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট এবং অর্থ পাচারে সমালোচনা করেন। অর্ন্তর্বতীকালীন সরকারের ১৮ মাসের সময়কালীন কর্মকাণ্ডের তদন্ত করতে প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। ওই তদন্ত প্রতিবেদন জাতির সামনে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দেন।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন ও জাতীয় স্বার্থে সবাই মিলে একমত হয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছে। এরপর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে।’
গত কয়েক দিন আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যেখানে বর্তমান সরকারের সময় সর্বাধিক দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। যদিও ওই রিপোর্টটি এখন আমার কাছে নেই, তথাপি বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এই ১৮ মাসের অস্থির সময়ে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এবং কারা এর পেছনে জড়িত, সেগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে খুঁজে বের করা উচিত।’ বর্তমান সরকারের ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, তাই যেকোনো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অতীত ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি জানান, ‘২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাবে এক ধরনের লুটেরা অর্থনীতি ও ক্রনি ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল। এই সময়কালীন প্রতি বছর গড় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং গত ১৫ বছরে মোট ২৯ থেকে ৩০ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে লোন স্ক্যাম, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক দখল এবং মেগাপ্রজেক্টের নামে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ জনগণের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে আইনি মোড়কে দুর্নীতি বা লেজিসলেটিভ ম্যানিপুলেটেড করাপশন ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক, যার মাধ্যমে কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলোকে ইনডেমনিটি দিয়ে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে।’ পাশাপাশি আদম ব্যবসার মাধ্যমে ১৩ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ৭৩ শতাংশ বরাদ্দ রাজনৈতিক বিবেচনায় অপাত্রে দেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এই অবস্থার পর ৯ লক্ষ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছে বর্তমান সরকার। বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার পতন ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। যমুনার অভ্যন্তরে ও কিনারে যে বহুমুখী সংকট ছিল, সেই অস্থির সময় আমলে নিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে জুলাই সনদে সমঝোতের মাধ্যমে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। দেশের মানুষের কল্যাণে বর্তমান নেতৃত্ব সবসময় সময়ের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়ে কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদাসল ঋণ মওকুফের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এবারের বাজেটকে ‘এ বাজেট অফ নিউ ইকোনমিক অর্ডার’ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পুরাতন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক বাস্টিয়া কিংবা ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম ইওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোনের জনকল্যাণমুখী দর্শনের আলোকে এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, টেকনাফের সীমান্তের একজন অসহায় বিধবা মহিলাও যেন এই বাজেটের সুফল পান, সেই লক্ষ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কোনো ধরনের ট্যাক্স বাড়ানো হয়নি। ফলে এবার বাজেট দেওয়ার আগে পরে কোনো নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি।’
মূল দর্শন হিসেবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্মার্ট রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ এবং ড. গোহ-এর সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সফল মডেলের উদাহরণ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘নোবেলজয়ী জোসেফ স্টিগলিৎসের তত্ত্বের আলোকেই বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মাল্টি-পোলার বিশ্বে বাংলাদেশকে নিজস্ব সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে মিল রেখে এই বাজেটে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মামলা-মোকদ্দমার শিকার পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’ এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সকলের সহায়তায় এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন