০১:২৫ এম
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগর পাড়ের ঐতিহাসিক বাসভবন সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শুক্রবার রাতে এই দাবির প্রেক্ষিতে বাড়ির সামনে স্থাপিত সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইনবোর্ড ভাঙার একাধিক ভিডিও ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের দুই বারের সংসদ সদস্য আরমা দত্ত রাতের এই ঘটনার জন্য ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে বিভিন্ন সময় বাড়িটি সংস্কার, স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি আরমা দত্ত ওই সম্পত্তির বৈধ ওয়ারিশ দাবি করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি এই সম্পত্তির ওয়ারিশ। আরমা, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে। সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’
এনসিপি নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তারা জানান, বাড়ি বিক্রির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পুরোনো স্থাপনা সরানোর চেষ্টা চলছে। সুতরাং, বাড়ি বিক্রি প্রতিহত করতে সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্লাস্টিক দূষণ বন্ধের এখনই সময়: বরিশালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আলোচনা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যার পর এনসিপি নেতারা সেখানে গিয়ে প্রথমে বাড়িটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। পরে তারা সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন।
রাত ১০টার দিকে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সাধারণ কোনো স্থাপনা নয়; এটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই, বাড়িটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও অভিযোগ করা হয়, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তারা সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করবেন।
এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার সমকালকে বলেন, "আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাবো। যদি এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।"
মুঠোফোনে আরমা দত্ত সমকালকে বলেন, "এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। কুমিল্লাবাসীও এ বিষয়ে অবগত। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করবো, রাখবো না বিক্রি করবো, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করবো।"
আরও পড়ুন: বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড কে ভেঙেছে, এ বিষয়ে এখনো কেউ অবহিত করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন