১০:৩৩ এম
রাজধানীর ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ইতোমধ্যে ১২টি পয়েন্টে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
আগামী মাসখানেকের মধ্যে এই সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে ট্রাফিক বিভাগ।
একই সঙ্গে যানজট কমাতে গত প্রায় এক বছরে নগরীর ৭৫টি পয়েন্টে সড়ক ডাইভারশন ও প্রকৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারিসহ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে ডিএমপির।
আরও পড়ুন: বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার ১৯ অক্টোবর
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে ডিএমপি ট্রাফিকে প্রায় ৪ হাজার ১০০ সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তবে ছুটি, প্রশিক্ষণ ও অসুস্থতার কারণে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ সদস্য রাজধানীর ৬৬৮টি ট্রাফিক পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি পয়েন্টে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব পয়েন্টে তিন পালায় ডিউটি চলে।
বাকি অধিকাংশ পয়েন্টে দুই পালায় দায়িত্ব পালন করা হয়।
আনিছুর রহমান বলেন, সীমিত জনবল দিয়েই রাজধানীর যানজট কমাতে গত প্রায় এক বছরে ৭৫টি পয়েন্টে ডাইভারশন ও বিভিন্ন ধরনের মডিফিকেশন করা হয়েছে। কোথাও ডাইভারশন দেওয়া হয়েছে, কোথাও সড়কের চলাচল ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে এখন পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের যানজট বা নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। বরং মাঠপর্যায়ে যানজট কমার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান
তিনি বলেন, রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে আসাদ গেটের ওপাশে চার রাস্তার মোড়ে আগে প্রায়ই যানজট লেগে থাকত এবং সেখানে ট্রাফিক সদস্য মোতায়েন করতে হতো। পরে ওই মোড়ে সরাসরি চলাচল বন্ধ করে বাম দিকে ঘুরে অল্প দূরে ইউটার্ন নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে বাম লেন সব সময় সচল থাকছে এবং যানবাহনের চাকা আর থেমে থাকছে না। ওই জংশন পরিচালনায় ৮ জন পর্যন্ত সদস্য কমানো সম্ভব হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, একই ধরনের ডাইভারশন ও মডিফিকেশন মোহাম্মদপুরের বসিলা, বনানীর কাকলী, মিরপুরের ইসিবি চত্বর ও কালশী ফ্লাইওভারের নিচেও করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের মতে, ঢাকা একটি অত্যন্ত জনবহুল মেগাসিটি। এখানে শুধুমাত্র ট্রাফিক সদস্যের সংখ্যা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সড়কের নকশা বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিকভাবে ডাইভারশন ও মডিফিকেশন করা হলে সেটিই সবচেয়ে কার্যকর হয়। এ কারণে ৭৫টি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান জনবল দিয়েই আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, কোথায় কখন যানজট বেশি হয়, সে বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোথাও পিক আওয়ার, কোথাও অফ-পিক আওয়ার। সে অনুযায়ী সদস্য মোতায়েন করা হয়। তবে শুধু ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে দীর্ঘদিন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ ব্যবস্থার সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যুক্ত করতে হবে। সেটিই হবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান।
আনিছুর রহমান বলেন, রাজধানীতে পর্যায়ক্রমে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। বর্তমানে ১২টি পয়েন্টে এই ব্যবস্থা রয়েছে। আগামী মাসখানেকের মধ্যে তা ৬০টি পয়েন্ট অতিক্রম করবে। এরপর আগামী ছয় মাসে রাজধানীর প্রধান ১২০টি পয়েন্টকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার সোমবার
তিনি বলেন, বর্তমান সিগন্যালগুলো ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী সিগন্যালের সময় পরিবর্তন করা সম্ভব। তবে উন্নত দেশগুলোতে একটি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পুরো সিস্টেম পরিচালিত হয়। একটি সিগন্যাল আরেকটি সিগন্যালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কতটি যানবাহন এসেছে, তার ভিত্তিতে ৪০, ৬০, ৮০ সেকেন্ড বা কতক্ষণ সিগন্যাল চালু থাকবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয় এবং পাশের জংশনের সঙ্গেও সমন্বয় করা হয়।
বর্তমানে সেমি-অটোমেটিক ব্যবস্থা চালুর কারণ ব্যাখ্যা করে আনিছুর রহমান বলেন, উন্নত দেশগুলোর সড়ক অত্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত ও প্রকৌশলগতভাবে নির্মিত। কোথায় কীভাবে মোড় হবে, কত ডিগ্রি কোণে বাঁক থাকবে, কোথায় উঁচু বা নিচু হবেÑসবই পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়। বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থা শুরু থেকেই সে ধরনের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠেনি। তাই উন্নত দেশের মডেল পুরোপুরি এখানে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
বর্তমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আনিছুর রহমান বলেন, গত দুই মাসে নগরবাসীর কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সহযোগিতা পাওয়া গেছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন, সিগন্যাল অনুসরণ করছেন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখছেন। এর ফলে আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ঘটনা অনেকাংশে কমেছে।
তবে তিনি বলেন, ঢাকার সব সমস্যা শেষ হয়ে যায়নি। ভারী বৃষ্টিপাত হলেই এখনো সড়ক অচল হয়ে যায়। আবার সড়ক অবরোধ করে মিছিল, মিটিং ও বিক্ষোভও যান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তাই ঢাকার যানজটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তেজগাঁওয়ের সমস্যা মতিঝিলকে, আবার মিরপুরের সমস্যা ওয়ারীকেও প্রভাবিত করে।
আরও পড়ুন: বিএনপি নেতা শাহরিয়ার কবির রুবেল তেলের দাম নিয়ে ফেসবুকে পোস্টে বহিষ্কার
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, ভারী বৃষ্টিপাতের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে অটোমেটিক সিস্টেম কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ম্যানুয়ালি সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তবে ভবিষ্যতে পুরোপুরি অটোমেটিক ব্যবস্থায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রস্তুতি চলছে। তবে এর বাস্তবায়ন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করবে বলেও জানান তিনি।
যানজট নিরসনে শুধু ট্রাফিক পুলিশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে আনিছুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা এবং সড়ক ব্যবহারকারী প্রত্যেক মানুষেরই দায়িত্ব রয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশের বড় সমস্যা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। অনেক সময় প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছাড়াই রাতারাতি রাস্তা কেটে উন্নয়নকাজ শুরু করা হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে আগাম যোগাযোগও করে না।
তিনি বলেন, অনেক সময় সকালে দেখা যায়, রাতের বেলায় রাস্তা কেটে রাখা হলেও দিনের বেলায় সেখানে কোনো কাজই হচ্ছে না। এতে যান চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। আবার বিভিন্ন সংস্থা কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় ট্রাফিক সিগন্যালের কেবল কেটে ফেলায় পুরো সিগন্যাল ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।
আরও পড়ুন: বিএনপি সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে প্রতারণা করছে: সারোয়ার তুষার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন