০৮:৩৫ এম
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত এবং কঠোর। পশ্চিমা দেশগুলো ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করে; রুশ পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়, রাশিয়ার পেমেন্ট সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং রাশিয়ার তেল বিক্রির ওপর মূল্যসীমা আরোপ করা হয়, যাতে ক্রেমলিনের তহবিল শূন্য হয়ে যায়।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, মাল্টার পতাকাবাহী 'আজিওই ফ্যানেন্দেস' নামের একটি ট্যাঙ্কার ৩ লাখ ব্যারেল রুশ ডিজেল নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে চলেছে; যা মস্কোর প্রতি ওয়াশিংটনের অবস্থানের একটি নাটকীয় পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে।
ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ রাশিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে 'একঘরে' থাকার তকমা ঘুচিয়ে দিচ্ছে। এটি পুতিনের প্রতিবেশী দেশের ওপর পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের জবাবে রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার এবং দেশটির অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বছরের পর বছর ধরে চালানো প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
আরও পড়ুন: কলম্বিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় তিন সেনা নিহত
সাবেক মার্কিন ট্রেজারি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি বেন হ্যারিস, যিনি রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রচেষ্টার সাথে জড়িত ছিলেন, বলেন, ‘২০২২ সালের শুরুর দিকে একটি খুব জোরালো ধারণা ছিল যে আমরা মার্কিন উপকূলে রুশ তেলের একটি ফোঁটাও চাই না, এবং এটি কেবল মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকেই নয়, বরং পুরো খাতের পক্ষ থেকেও ছিল।’ বর্তমানে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং অর্থনৈতিক গবেষণা পরিচালক হ্যারিস আরও যোগ করেন, ’ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় যে তিনি আসলে রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করার মধ্যে কোনো সুবিধা দেখছেন না এবং নিষেধাজ্ঞা যে যুদ্ধ শেষ করার কোনো পথ হতে পারে, তাও তিনি মনে করেন না।’ সিএনএন-কে তিনি বলেন, ’তিনি (ট্রাম্প) রাশিয়ার এই আগ্রাসনকে আদৌ কোনো সমস্যা হিসেবে দেখেন কি না, তা সত্যিই অস্পষ্ট।’ ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে তিনি অত্যন্ত হতাশাজনক বলে বর্ণনা করেছেন।
রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার ট্রাম্পের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নেওয়া হয়েছিল, যখন জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম ভোটারদের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল। ডিজেলের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যেখানে ইরানের যুদ্ধের আগে জাতীয়ভাবে এই দাম ছিল প্রতি গ্যালন ৩.৭৬ ডলার। পেট্রোলের দাম এখন প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের ওপরে, যা এক বছর আগের ৩ ডলারের চেয়ে অনেক বেশি।
তবে ট্রাম্পের এই ডিজেল কেনাকাটা জ্বালানীর দাম কমাতে কোনো ভূমিকাই রাখবে না। এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, আজিওই ফ্যানেন্দেস-এ থাকা তেলের পরিমাণ কেবল মার্কিন পরিবহন খাতের একদিনের ব্যবহারের মাত্র ১০ শতাংশের সমান। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশিয়ার সম্পূর্ণ ২২ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করা হলেও, তা আমেরিকার একদিনের চাহিদাও পূরণ করতে পারবে না। তবুও, এই চুক্তিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে আরও বেশ কয়েকটি লেনদেনের প্রথম ধাপ হতে পারে, যা গত চার বছরের নীতি থেকে একটি বড় ধরনের বিচ্যুতি।
ইউক্রেনে কোনো যুদ্ধবিরতি না হওয়া এবং রুশ আগ্রাসন বন্ধ করার মতো কোনো স্পষ্ট শর্ত ছাড়াই এই সম্ভাব্য ব্যবসায়িক চুক্তিগুলোর খবর আসছে; যার মধ্যে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র ডেটা সেন্টার প্রকল্প থেকে শুরু করে আর্কটিকে যৌথ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উদ্যোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন: সানায় হামলার জবাবে সৌদিতে দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল হুতিরা
ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো থমাস রাইট বলেন, ’ডিজেল চুক্তিটি হয়তো এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম আভাস, যা মানুষকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছে কারণ অদূর ভবিষ্যতে এর ফলে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’ রয়টার্স গত মঙ্গলবার জানিয়েছে যে, মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্তকারী একটি কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্বে রাশিয়ার প্রধান তেল কোম্পানি লুকঅয়েলের আন্তর্জাতিক সম্পদের একটি চুক্তি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস রাশিয়ার সাথে বর্তমান বা ভবিষ্যতের এই চুক্তিগুলোকে কীভাবে বা আদৌ প্রভাবিত করতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে ট্রাম্পের এখনও ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, যা তিনি পররাষ্ট্র নীতিতে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে ব্যবহার করতে পারেন।
নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন এবং ক্রেমলিন রাশিয়ার বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম তহবিলের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাব্য বিষয়ে আলোচনা করেছিল। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর বাইডেন প্রশাসন প্রথম এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল এবং এটিকে পুতিন ও তার ঘনিষ্ঠদের একটি ’গোপন তহবিল’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা গত সপ্তাহে জানিয়েছেন যে, প্রশাসন মার্কিন-রাশিয়া সম্পর্কের উন্নতি এবং যুদ্ধ শেষ করতে সহায়তার প্রচেষ্টায় এই ফান্ডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য তার স্বাভাবিক প্রক্রিয় পরিচালনা করছে।
আরও পড়ুন: সৌদিতে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ৩৩ নিহতের দাবি রিয়াদের
পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের এই সমঝোতামূলক মনোভাবের আরও একটি লক্ষণ দেখা গেছে যে, গত মাসে রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানি বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে ট্রাম্প সেটি স্থগিত করেন, যা দুই দলের মধ্যেই তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
এই পদক্ষেপগুলো 'গ্রাহাম অ্যাক্ট'-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা গত জুলাইয়ে মারা যাওয়া বিশিষ্ট রাশিয়া-বিরোধী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা আইন। গ্রাহাম অ্যাক্ট কার্যকর হলে তা ভারতসহ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বা গ্যাসের পাঁচটি বৃহত্তম আমদানিকারক দেশের ওপরও শুল্ক আরোপ করত।
কিয়েভ স্কুল অফ ইকোনমিক্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের সিনিয়র ফেলো এলিনা রিবাকোভার মতে, এই ডিজেল চুক্তির ফলে ভারত এবং রাশিয়ার রপ্তানি পণ্যের অন্যান্য ক্রেতারা (চীনসহ) এখন সম্ভাব্য পরিণতির ভয় কম পাবে। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের এই ডিজেল চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
রুশ ডিজেল নিয়ে আজিওই ফ্যানেন্দেস শেষ পর্যন্ত মার্কিন উপকূলে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনও দেখার বিষয়। রাশিয়ার ডিজেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আসা অন্য দুটি নিষেধাজ্ঞা-প্রাপ্ত তেল ট্যাঙ্কার ইতিমধ্যেই তাদের পথ পরিবর্তন করেছে। কেপলারের কমোডিটি রিসার্চ ডিরেক্টর ম্যাট স্মিথের মতে, সম্ভবত আইনি পরিণতির ভয়ে মার্কিন ক্রেতাদের দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণেই এমনটা হয়েছে। তিনি সিএনএন-কে বলেন, ‘আজিওই ফ্যানেন্দেস এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে, তবে গত কয়েক দিনে এর গতি ধীর হয়ে গেছে।’
আরও পড়ুন: ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলায় নারী-শিশুসহ ৩৩ জন নিহত
তিনি আরও বলেন, ’এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পণ্য খালাস করার কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং এটিও অন্য দুটি ট্যাঙ্কারের মতো পথ পরিবর্তন করতে পারে।’
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার সিএনএন-কে বলেন, ’প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী রুশ ডিজেল সাগরে রয়েছে এবং বাজারের দিকে আসছে, যা আমেরিকানদের জন্য জ্বালানির দাম কমাবে।’
তবে নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট গভর্নর মিকি শেরিল রাজ্যের বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটরদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, রুশ ডিজেল আমদানি করা ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করে এবং এর ফলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি শাস্তি হতে পারে। সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ’ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকানদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে ভ্লাদিমির পুতিনকে সমর্থন করার সময় নিউ জার্সি চুপচাপ বসে থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ’খরচ কমানোর পরিবর্তে তিনি পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী সহিংসতা ও সন্ত্রাসের অর্থায়নে সহায়তা করছেন, যা বিদেশে কর্মরত মার্কিন সেনাসদস্যদের বিপন্ন করে তুলছে।’
আরও পড়ুন: হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে সংঘাতের আশঙ্কা
ব্রুকিংসের হ্যারিসের মতে, বেসরকারি খাত রাশিয়ার এই তেলের ব্যারেলগুলো থেকে দূরে থাকছে। তিনি বলেন, ’আপনি রুশ ডিজেলের জন্য কোনো ক্রেতা খুঁজে পাবেন না। আপনি যা দেখছেন তা হলো, বেসরকারি খাতের নৈতিকতার স্তর হোয়াইট হাউসের চেয়ে আলাদা।’
সূত্র : সিএনএন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন