০৩:৪৮ এম
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ধারাবাহিকভাবে সরকারি ব্যয় বাড়ছে, তাও জনভোগান্তি কমছে না। বরং এই সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে। বৃষ্টি হলেও পানির নিচে তলিয়ে রাজপথে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় ও সবুজ এলাকার নিয়মিত হ্রাসের কারণে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পানি জমে স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন। রাজধানীর এই সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন ড্রেন নির্মাণের পাশাপাশি প্রকৃতিভিত্তিক অবকাঠামো এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। ঢাকায় এখনো শহরব্যাপী একটি সমন্বিত সবুজ অবকাঠামো কিংবা জলসংবেদনশীল বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেনি। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত থাকার কারণে পেরেশানি বাড়ছে, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদ, ওয়াসা এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশন থেকে আসা তথ্য অনুযায়ী, কঠিন পরিস্থিতিটির জন্য দায়ী অনেক ফ্যাক্টর রয়েছে। সূত্রগুলোর মতে, রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের ১৪১টি এলাকা জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে।
চলতি বছরে ওই এলাকার বৃষ্টিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে ছিল। নানা স্থানে ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন এবং কঠিন বর্জ্য জমে যাওয়ার কারণে পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারেনি। আবার কোথাও খাল দখল এবং কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অথচ রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি ব্যয় নিয়মিতভাবে বাড়ছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের দুটি সিটি কর্পোরেশনের আওতায় প্রায় ৩৩৪ কিলোমিটার ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে এবং এতে ব্যয় হয়েছে ২৬২ কোটিরও বেশি টাকা। তাছাড়া, খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন পরিষ্কার, পাম্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও প্রতি বছর আলাদা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ও খাল উন্নয়নে হাজার কোটি টাকার বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তথাপি বর্ষাকালে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে তীব্র জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, গত ৩০ বছরে ব্যাপক নির্মাণের পরও কার্যকর ও টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি; আর এর ফলে নগরীতে জলাবদ্ধতার সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর খাল-নালা রক্ষণাবেক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসন পূর্বে ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগের প্রধান দায়িত্বে ছিল। কিন্তু ওয়াসা যখন এই দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেছে, তখন থেকে দীর্ঘসময়েও সিটি কর্পোরেশন পূর্ণাঙ্গ ড্রেনেজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই বিভাগে এখনো প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল এবং অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টির ফলে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যাচ্ছে। বিগত ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসা থেকে গ্রহণ করেছে। সেক্ষেত্রে যুক্তি ছিল, সড়ক, খাল, ড্রেন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয় বাড়ানোর মাধ্যমে জলাবদ্ধতার সমস্যার সমাধান হবে। সেই কারণে ২৬টি খাল, স্টর্ম স্যুয়ার এবং বক্স কালভার্ট দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে প্রায় সাড়ে ৫ বছর পরে বরং রাজধানীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত উন্নতি এখনও দৃশ্যমান হয়নি। সূত্র আরও জানায়, সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের একটি মূল্যায়নে জানিয়েছে, ঢাকার স্যানিটেশন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপলাইনভিত্তিক স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। দ্রুত নগরায়ণ, খাল দখল, দূষণ এবং দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ক্রমশ চাপে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকদের মতে, বর্তমানে ঢাকা জলবায়ু ও বন্যা-ঝুঁকিপূর্ণ মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে, যা দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ও জলাশয় ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কমপ্লেক্স হয়ে উঠেছে। কংক্রিটনির্ভর ড্রেনেজ ব্যবস্থা দ্বারা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রকৃতিভিত্তিক এবং সবুজ অবকাঠামোর সংরক্ষণ, জলাধার সংরক্ষণ ও বৃষ্টির পানি ধারণ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এর জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ ও শোষণের সক্ষমতা উন্নত করা প্রয়োজন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: সিজেপির দুই মুখপাত্র এক সপ্তাহ পর মুক্তি
এ ছাড়া তা না হলে প্রতি বছর নতুন প্রকল্প ও বাড়তি বরাদ্দের পরেও রাজধানীর বাসিন্দাদের একই দুর্ভোগের মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা বাড়ার পেছনে পাবলিক অসচেতনতা, স্লুইস গেট বন্ধ হয়ে যাওয়া, ড্রেনেজ পথের দূরত্ব বেশি হওয়া, জলাশয় কমে যাওয়া এবং ঢাকায় ক্যাপাসিটির তুলনায় বিপুল লোকের বসবাসসহ বেশ কিছু কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এর মধ্যে মানুষের অসচেতনতাই অন্যতম। বর্তমানে জলাবদ্ধতা কমাতে ড্রেনেজ ডিজাইন পরিবর্তন, পানি নামার জন্য রাস্তার দূরত্ব কমানোসহ বেশকিছু পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তবে জনবলের ঘাটতি রয়েছে, এবং এখনো সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব ড্রেনেজ সার্কেল চালু হয়নি। জনবল নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে কিন্তু থমকিয়ে আছে অনুমোদন। জলাবদ্ধতা নিরসনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায় নগরবাসীর ভোগান্তি কিছুটা কমবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন