১০:১৮ পি.এম
গাজীপুর, ৮ আগস্ট, ২০২৬ : ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে জীবন ফিরেছে। পাশাপাশি গুগল-মেটা ও টিকটকের কাছ থেকেও বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
আজ (শনিবার) গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক পরিদর্শনে গিয়ে মন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। দেশের প্রথম এই হাই-টেক পার্কে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ সরেজমিনে দেখতে মন্ত্রী সেখানে যান।
এই পরিদর্শন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতির একটি অংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে আইসিটি খাতে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারের জন্য প্রতিযোগিতামূলক করার অঙ্গীকার রয়েছে।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আনতে বাংলাদেশের ৮০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা
এ প্রসঙ্গে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী জানান, নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ‘ন্যাশনাল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ বাস্তবায়ন ও এআই হাব এবং সফটওয়্যার-অ্যাপ-হার্ডওয়্যার উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য ফিসকাল ও নন-ফিসকাল প্রণোদনার প্রস্তাবনাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মাহবুব আনাম স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দেশে প্রথম ‘আইসিটি পলিসি-২০০২’ প্রণয়নের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কালিয়াকৈরে ২৩১.৬৫ একর জমিতে হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালে আরও ৯৭.৩৩ একর জমি যুক্ত করা হয়। বর্তমানে পার্কের মোট আয়তন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭১ একরে।
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আরও বলেন, মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পর দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য জমি ও রেডি স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সফটওয়্যার, অ্যাপ, হার্ডওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে এ পর্যন্ত মোট ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ৭টি। ইতোমধ্যে ৪০টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে, ২৮টি নির্মাণাধীন এবং ১৭টির শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে মির্জা ফয়সল আমীনকে নির্বাচিত ঘোষণা, গেজেট প্রকাশ
পার্কে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ১.৬৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা)। আর এই পরিমাণে সরকার মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি। ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম যথাযথভাবে গড়ে তোলা গেলে পার্কটি থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলেও মন্ত্রী জানান।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট প্রায় ৬২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। ফলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কেবল দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং ভবিষ্যতে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা-উন্নয়ন ও রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ও হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে পার্কটিতে ৩টি মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী (অনর, শাওমী ইত্যাদি), ২টি ল্যাপটপ উৎপাদনকারী, ১টি এটিএম ও ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন উৎপাদনকারী, ৬টি ফাইবার অপটিক্যাল কেবল উৎপাদনকারী এবং ৩টি গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান (হুন্দাইসহ) কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ ছাড়া আইওটি ডিভাইস, রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, এসি, রেফ্রিজারেটর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, কিওস্ক ও এটিএম মেশিনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জয়পুরহাটে ট্রাক-ইজিবাইক মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ জন নিহত
ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ করছে ২টি কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা (ফেসবুক) ও টিকটকসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন।
বিনিয়োগবান্ধব নীতির প্রণয়নের প্রশ্নে মাহবুব আনাম জানান, হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সেবায় ভ্যাট সুবিধা, হাই-টেক পণ্যের তালিকা সম্প্রসারণ এবং ম্যানুফেকশ্চারের পাশাপাশি অ্যাসেম্বলরদেরও সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
একইসঙ্গে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের শুল্ক-কর রেয়াত, স্থিতিশীল আয়কর সুবিধা এবং ইভি ব্যাটারি, সোলার ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি, ই-বাইকের মতো নতুন প্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা কাঠামো তৈরির প্রস্তাবও তৈরি করা হচ্ছে।
অবকাঠামোগত সক্ষমতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগের গতি আরো বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন: স্কাউট সদস্যরাই আগামীর কাণ্ডারী : হুইপ দুলু
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর এই পরিদর্শন দেশের হাই-টেক শিল্পের বর্তমান অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এ সময় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ (ইউএফটিবি)-এ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন মন্ত্রী।
আরও পড়ুন: সাত দিনের সফরে ফ্রান্স যাচ্ছেন আইজিপি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন