১০:৩৯ এম
মঙ্গল গ্রহে উড়তে পারে এমন একটি ছোট হেলিকপ্টার তৈরির পরিকল্পনার শুরুতে হয়তো কেউ ভাবেননি, এটি মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এত বড় পরিবর্তন আনবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটে।
নাসার ইনজেনুইটি হেলিকপ্টার শুধু অন্য একটি গ্রহে প্রথমবারের জন্য নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়ন করেনি, বরং ভবিষ্যতের গ্রহ অনুসন্ধানের নতুন পথও উন্মোচিত করেছে।
আরও পড়ুন: সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল) এবং অ্যারোভাইরনমেন্টের প্রকৌশলীরা ২০০০ সালের শুরুর দিকে এই ধারণা নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার পর ২০১৮ সালের ১১ মে নাসা ঘোষণা দেয়, তাদের ‘মার্স ২০২০’ অভিযানের সঙ্গে একটি ছোট হেলিকপ্টারও মঙ্গল গ্রহে পাঠানো হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই বিজ্ঞানী ও মহাকাশ গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।
তবে তখন খুব কম মানুষের ধারণা ছিল যে, এই ছোট হেলিকপ্টার কোন একদিন মহাকাশ গবেষণার অন্যতম সফল প্রযুক্তি পরীক্ষায় পরিণত হবে।
ইনজেনুইটিকে শুরুতে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য খুবই সীমিত ছিল- মঙ্গল গ্রহের অত্যন্ত পাতলা বায়ুমণ্ডলে একটি হেলিকপ্টার উড়তে পারে কি না, সেটি প্রমাণ করা। বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন, হালকা ওজনের একটি উড়ন্ত যান সেখানে নিরাপদে উড্ডয়ন এবং কার্যক্রম চালাতে পারে কি না।
এটি সফল হলে ভবিষ্যতে রোভার বা মহাকাশযানগুলোর আগে আকাশপথে এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে পারতো। এতে বিপজ্জনক স্থানের এড়িয়ে নিরাপদ পথ নির্ধারণ করা সহজ হয়ে যেত। একই সঙ্গে উপর থেকে এমন অনেক ভূতাত্ত্বিক গঠন দেখা যেত, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে শনাক্ত করা কঠিন ছিল। ফলে মঙ্গলের পৃষ্ঠে অনুসন্ধানের কাজ আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো।
আরও পড়ুন: রাশিয়া ও চীনের প্রধানমন্ত্রী সেন্ট পিটার্সবার্গে বৈঠকে মিলিত
২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল ইনজেনুইটি ইতিহাস গড়ে। সেদিন এটি প্রথমবারের মতো অন্য কোনো গ্রহে শক্তি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছিল। এই ঘটনাকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হকে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম উড্ডয়নের সঙ্গে তুলনা করেন। নাসা এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে স্মরণীয় করে রাখতে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের বিখ্যাত ‘রাইট ফ্লায়ার’ বিমানের কাপড়ের একটি ছোট টুকরা ইনজেনুইটির সঙ্গে বহন করেছিল। এই সফল উড্ডয়ন শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত অর্জন ছিল না, এটি মানবজাতির মহাকাশ অনুসন্ধানের নতুন অধ্যায়েরও সূচনা করে।
শুরুতে পরিকল্পনা ছিল মাত্র ৩০ দিনের একটি পরীক্ষামূলক মিশনের পরিচালনা করার এবং ইনজেনুইটি সর্বাধিক পাঁচবার উড়বে। কিন্তু বাস্তবে এই ছোট হেলিকপ্টার প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করতে থাকে। মিশন শেষ হওয়ার আগে এটি মোট ৭২টি সফল উড্ডয়ন সম্পন্ন করে। ফলে এটি শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক যন্ত্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মঙ্গলে থাকা পারসিভিয়ারেন্স রোভারের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠে। এর সাফল্য প্রদর্শন করে যে, ভবিষ্যতের গ্রহ অভিযানে আকাশপথে চলাচলকারী যান যুক্ত হলে অনুসন্ধানের গতি ও কার্যকারিতা অনেক বাড়বে।
মঙ্গল গ্রহে উড্ডয়ন করা পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। কারণ, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডলের মাত্র ১ শতাংশ ঘন। এত পাতলা বায়ুতে ভেসে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তোলন শক্তি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইনজেনুইটির দুটি কার্বন ফাইবার ব্লেড প্রতি মিনিটে প্রায় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ বার ঘুরত। পৃথিবীর অধিকাংশ হেলিকপ্টারের তুলনায় এটি অনেক বেশি গতি। এছাড়া, প্রকৌশলীদের ধুলাবালি, তীব্র বিকিরণ এবং রাতে মাইনাস ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যাওয়া তাপমাত্রার মতো কঠিন পরিবেশের মোকাবিলা করতে হয়েছে। এমন অবস্থাতেও ইনজেনুইটি সফলভাবে উড়তে পেরেছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজও করেছে।
ইনজেনুইটির আগে মঙ্গল গ্রহে রোভার পরিচালনা ছিল ধীর ও জটিল একটি কাজ। রোভারকে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে দীর্ঘ পরিকল্পনা করতে হতো। মিশন পরিচালনাকারীরা মূলত মাটি থেকে তোলা ছবির ওপর নির্ভর করতেন। ফলে নিরাপদ পথ নির্বাচন অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়তো। অপরচুনিটি এবং কিউরিওসিটির মতো রোভারগুলোকে মাঝে মাঝে পথ পরিবর্তন করতে হয়েছে। কখনও কখনও বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে আবার আগের পথে ফিরে যেতে হয়েছে। ২০১৪ সালে অপরচুনিটি রোভার নরম মাটিতে আটকে গেলে প্রকৌশলীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে উদ্ধার পরিকল্পনা পরীক্ষা করেন। পরে সেটিকে মুক্ত করা সম্ভব হয়। ইনজেনুইটি সেই সীমাবদ্ধতা দূর করার একটি কার্যকর সমাধান দেখিয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে সামরিক যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত, নিহত ১, নিখোঁজ ১
মজার বিষয় হলো, ইনজেনুইটির মিশন কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা বৈরী পরিবেশের কারণে শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ৭২তম উড্ডয়নের সময় এটি অবতরণের আগে মাটির দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়নি। ফলে নেভিগেশন ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং হেলিকপ্টারটি শক্তভাবে সবলে অবতরণ করে। এতে এর ব্লেডগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীকালে মেরামত করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্য দিয়েই ইনজেনুইটির মিশনের সমাপ্তি ঘটে। তবে শেষ মুহূর্তেও এটি বিজ্ঞানীদের জন্য মূল্যবান তথ্য প্রদান করে গেছে।
ইনজেনুইটির সাফল্যের গল্প যতটা উজ্জ্বল, শুরুটা ততটাই সহজ ছিল না। নাসা এবং জেপিএলের অনেক বিজ্ঞানী প্রথমে এই প্রকল্প নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, অতিরিক্ত খরচ, সময় এবং প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে মূল বৈজ্ঞানিক মিশন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পারসিভিয়ারেন্স প্রকল্পের বিজ্ঞানী কেনেথ ফারলি তখন বলেছিলেন, "যদি কয়েক সপ্তাহ শুধু উড্ডয়ন পরীক্ষাতেই ব্যয় হয়, তাহলে রোভারের মূল গবেষণা কার্যক্রম পিছিয়ে যেতে পারে।" তবে ইনজেনুইটির ধারাবাহিক সাফল্য দ্রুত সেই সন্দেহ দূর করে দেয়। শেষ পর্যন্ত এটি মঙ্গল অভিযানের সবচেয়ে সফল প্রযুক্তি পরীক্ষাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
ইনজেনুইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি প্রমাণ করেছে মঙ্গল গ্রহে নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়ন শুধু সম্ভবই নয়, বরং এটি গ্রহ অনুসন্ধানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। এই মিশন আরও দেখিয়েছে, সাধারণ ভোক্তাপর্যায়ের প্রযুক্তি—যেমন স্মার্টফোনে ব্যবহৃত প্রসেসর—যথাযথভাবে পরিবর্তন করে মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে প্রকৌশলীরা এখন অনেক ভালোভাবে বুঝতে পারছেন, মঙ্গলের মতো পরিবেশে উড়ন্ত যান কীভাবে কাজ করে, কী ধরনের নকশা সবচেয়ে কার্যকর এবং কোন সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নেভিগেশন, সেন্সর প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় উড্ডয়ন ব্যবস্থার উন্নয়নে ইনজেনুইটির অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ফিজি সফরে ইসরাইলের প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফোরামের অংশীদারিত্ব
সব মিলিয়ে ইনজেনুইটি শুধুমাত্র একটি সফল প্রযুক্তির পরীক্ষা নয়। এটি গ্রহ অনুসন্ধানের একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। ছোট এই হেলিকপ্টার দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে শুধুমাত্র মঙ্গল নয়, সৌরজগতের আরও অনেক গ্রহ ও উপগ্রহে আকাশপথে অনুসন্ধান চালানো সম্ভব। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, আগামী কয়েক দশকে যে নতুন প্রজন্মের মহাকাশ ড্রোন তৈরি হবে, তাদের পেছনে ইনজেনুইটির অবদান থাকবে সবচেয়ে বেশি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন