০৬:৩৯ পি.এম
শরীয়তপুর, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ : জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে পেঁয়াজ ও রসুনের আবাদ শুরু হয়ে গেছে। কৃষকরা বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রেখে বিনা চাষে পেঁয়াজ-রসুন রোপণের কাজে নেমে পড়েছেন তারা। উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি সময়মতো ফসল রোপণের লক্ষ্য নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে কাজ করে চলেছেন। যদিও বীজ ও সারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশায় বুক বেঁধেছেন কৃষকরা।
শরীয়তপুরের মাটি ও কৃষি পরিবেশ পেঁয়াজ-রসুন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে উর্বর দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি, যেখানে পানি সহজে নিষ্কাশিত হয় এবং মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকে। এই কারণে এসব ফসলের ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
আরও পড়ুন: নলডাঙ্গায় দাঁড়িয়েও মিলছে না সার, ক্ষুব্ধ কৃষকরা
পেঁয়াজ ও রসুনের কন্দ মাটির নিচে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য জমির মাটি ঝরঝরে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের উপযোগী হওয়া জরুরি। অন্যদিকে, জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কন্দ পঁচে যাওয়া ও ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই কারণে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে উপযুক্ত আর্দ্রতা বজায় রেখে কৃষকরা আবাদ শুরু করছেন।
বিনা চাষে আবাদ পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো জমি প্রচলিত পদ্ধতিতে বারবার চাষ ও মই দিয়ে প্রস্তুত করার প্রয়োজন হয় না। এতে জমি তৈরির খরচ, সময় ও শ্রম কম লাগে। বিশেষ করে বন্যা বা বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর মাটিতে কাদা ও আর্দ্রতা থাকতেই রসুনসহ উপযোগী ফসল রোপণ করা সম্ভব।
অনেক কৃষক জমিতে খড় বা শুকনো উদ্ভিদাংশ ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। ফলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফসলের পরিচর্যাও কিছুটা সহজ হচ্ছে।
এ বছর শরীয়তপুরে জমি থেকে পানি নামতে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে। এর ফলে কৃষকদের আবাদ শুরু করতে দেরি হয়েছে। তবে পানি নেমে জমি রোপণের উপযোগী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরোদমে শুরু হয়েছে পেঁয়াজ ও রসুনের চাষ। কেউ জমিতে বীজ ও রসুনের কোয়া রোপণ করছেন, কেউ আবার জমির পরিচর্যা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক কৃষক নিজেরাই জমিতে কাজ করছেন। এতে শ্রমিকের খরচ কমিয়ে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
আরও পড়ুন: বিজ্ঞান ভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে কৃষকের চাষ পদ্ধতি
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৪ হাজার ৭শ’ একর জমিতে পেঁয়াজ এবং ৫ হাজার ২শ’ ৫০ হেক্টর জমিতে রসুন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মুড়ি কাটা পেঁয়াজ ৪ হাজার ৩৫০ হেক্টর ও হালি পিঁয়াজ ৩৫০ হেক্টর। ৫ হাজার ২শ’ ৫০ হেক্টর জমিতে রসুন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং ফসলের পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মো. জাহিদুল আলম বাসস’কে বলেন, ‘পেঁয়াজ ও রসুনের উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষক যাতে লাভবান হয়, আমরা তাদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। ফসল ছত্রাকমুক্ত রাখা এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে কৃষকদের নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি কোনো ডিলার যাতে সারের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে দাম বাড়াতে না পারেন, সে বিষয়েও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলা পর্যায় থেকে সরকারিভাবে কৃষকদের সার ও বীজ দেয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: দৌলতখানের কৃষকরা শীতকালীন সবজিতে স্বপ্ন বুনছেন
তবে উৎপাদন মৌসুমের শুরুতেই বীজ ও সারের বাড়তি দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। তাদের মতে, ফসল উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বাড়ছে। জমিতে শ্রম, বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণের ব্যয় মেটানোর পর বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে কাঙ্খিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তাই উৎপাদিত পেঁয়াজ ও রসুনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সারের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে জাজিরা উপজেলার কাজিরহাটের উত্তর ডুবুলদিয়া গ্রামের কৃষক আজমত উল্লাহ বাসস’কে বলেন, ‘মাঠের পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা পেঁয়াজ ও রসুনের আবাদ শুরু করেছি। আশা করছি, বীজ ও সারের দাম বেশি হলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই বছর ভালো ফলন পাব। নিজেরাই জমিতে কাজ করছি-যাতে শ্রমিকের খরচ কিছুটা কমানো যায়। তবে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পেলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।’
কৃষকদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ফসলের গুণগত মান বজায় রাখতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। পেঁয়াজ ও রসুনের জমিতে ছত্রাকজনিত রোগ, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতাজনিত সমস্যা মোকাবিলায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সুষম সার ব্যবহার, সঠিক সময়ে সেচ এবং জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখার বিষয়েও পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পেঁয়াজ ও রসুন দেশের নিত্য প্রয়োজনীয় মসলা ফসল। বাজারে এই দু’টি পণ্যের চাহিদা সারা বছরই থাকে। ফলে পরিকল্পিত আবাদ, উন্নত বীজের ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনুসরণ করা গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত করাও জরুরি।
আরও পড়ুন: তিস্তার চরে ভুট্টার বীজ রোপণে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রচেষ্টা
সব মিলিয়ে শরীয়তপুরের কৃষকদের মাঝে পেঁয়াজ-রসুন আবাদ নিয়ে এখন ব্যস্ততা ও প্রত্যাশা দু’টোই রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, কৃষি বিভাগের সহযোগিতা এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হলে এই মৌসুমে ভালো ফলনের পাশাপাশি কৃষকদের মুখে হাসি ফুটবে-এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় কৃষকদের।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন