১১:০৪ এম
ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বহুতল হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর ফলে ৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই কারণে রাজ্যের হোটেলগুলির অগ্নি নেভানোর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হোটেলের অতিথিদের অনেকের অভিযোগ রয়েছে, হোটেলে যথাযথ আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না।
সম্প্রতি, তারাপীঠের একটি হোটেলে আগুন লেগে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর কলকাতায় একই ধরনের ঘটনা ঘটায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত ব্যক্তিরা চিকিৎসা কিংবা ব্যবসার কাজে কলকাতায় এসেছিলেন। কিছু ব্যক্তির পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। রাত প্রায় ২টা নাগাদ হোটেলের তৃতীয় তলায় আগুন লেগেছে; দমকলের প্রাথমিক তদন্তে এই তথ্য উঠে এসেছে। পরে ধোঁয়া দ্রুত ছড়াতে থাকে ও ঘুমন্ত আবাসিকদের অনেকেই ঘরের ভিতরে আটকে পড়েন। আগুনের উৎস বা পরিস্থিতি বোঝার আগেই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় হোটেলের একাধিক অংশ।
আরও পড়ুন: ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় ৬৮৪ জন গ্রেপ্তার
কিছু ব্যক্তির শরীরে পোড়ার চিহ্ন রয়েছে। তবে মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয় যে, এটি আগুনে দগ্ধ হওয়া, নাকি ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ।
এই হোটেলটি পূর্বে একটি আবাসিক ভবন ছিল, কিন্তু গত তিন-চার বছরে এটি বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। ভবনটি ইংরেজি অক্ষর ‘এল’ আকৃতিতে তৈরি। পরবর্তীতে সেই বাড়িটিকে হোটেলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ঘরগুলি ছোট ছোট। মঙ্গলবার রাত ২টার সময় মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই বাড়ির তিনতলার একটি হোটেলে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়াতে পারলেও মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় গোটা বাড়ি ঢেকে যায়।
এই ধরনের বাণিজ্যিক ভবনে জরুরি প্রস্থান গেট থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ওই ভবনে সেই ধরনের কোনো জরুরি প্রস্থান গেট নেই। প্রবেশ এবং বের হওয়ার জন্য মাত্র একটি সরু গেট রয়েছে। এই ঘটনার পর হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অতিথিদের দাবি, সেখানে যথেষ্ট অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি আগুন লাগার পরও কোনো ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠেনি। ফলে বেশিরভাগ আবাসিকরা আগুনের খবর পান দেরিতে। এক অতিথি জানিয়েছেন, রাত আড়াইটা নাগাদ হোটেলের এক কর্মী এসে তাদের ঘুম থেকে তুলে দ্রুত বের হওয়ার কথা জানান। কিন্তু নীচে নামার পর বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সরু প্রবেশপথ এবং ধোঁয়ায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আবাসিকদের মধ্যে। পরবর্তীতে দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে তাদের বাইরে বের করে আনেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। এক আবাসিকের কথায়, হোটেলের ভিতর এতটাই ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল যে, সামনে কী রয়েছে, তা দেখা যাচ্ছিল না। শ্বাস নিতেও সমস্যা হচ্ছিল। দমকলকর্মীদের সহায়তায় তারা বেরিয়ে আসতে পেরেছেন বলে দাবি করেছিলেন। ঘটনার পর নিউমার্কেট এলাকার অন্য হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অনেক হোটেলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেগুলি কার্যকর কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না। কোথাও আবার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। তারাপীঠের ঘটনার পর মাত্র দু’দিনের মধ্যে কলকাতায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় উদ্বেগ আরো বেড়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ভানুয়াতুর উপকূলে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি
ঘটনাস্থলের কাছেই নিউমার্কেট থানা, কলকাতা পৌরসভা এবং খাদ্যভবন রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যে থাকা দমকল সদর দপ্তরের কাছের এলাকায় কীভাবে অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম উপেক্ষা করে হোটেল চলছিল, তা নিয়ে স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন। নিউমার্কেটের অন্যান্য হোটেলেও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে। কেন এসব এত দিনেও রাজ্য প্রশাসনের নজরে আসেনি, কিংবা বহুতলে হোটেল ব্যবসা চালানোর জন্য দমকলের ছাড়পত্র আদৌ হোটেল মালিকদের কাছে ছিল কিনা- এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তারাপীঠ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন দুই বন্ধু। তাদের একজন আমিরুল করিম জানিয়েছে, আগুন লাগার পর ধোঁয়ার কারণে হোটেলের ভিতরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তারা কোনও মতে প্রাণ বাঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। ওই ঘটনার আতঙ্ক এখনও কাটেনি বলেও জানান তিনি। অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলের আবাসিকদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ছয় জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে জানা গিয়েছে।
পরপর অগ্নিকাণ্ড এবং প্রাণহানির পর ফের সামনে এসেছে একই প্রশ্ন- নিরাপত্তা বিধি থাকা সত্ত্বেও কেন তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না? হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পরিদর্শন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, এই অগ্নিকাণ্ডের পর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে প্রশাসন। দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, 'কীভাবে এই হোটেলগুলো পারমিট পেল, ট্রেড লাইসেন্স পেল, তা তদন্ত করে দেখা খুবই প্রয়োজন। আমরা সব খতিয়ে দেখে কড়া ব্যবস্থা নেব। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার দিকে নজর রেখেছেন।' বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠক অভিযোগ করেছেন, ভবনটির মূল কাঠামো আবাসিক ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও পরে বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তার দাবি, হোটেলের ঘর বাড়ানোর জন্য ভবনের পিলার পর্যন্ত কাটা হয়েছিল। এতে কাঠামোগতভাবে ভবনটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে অভিযোগ তার।
আরও পড়ুন: সড়কের উন্নয়ন কাজ তদারকিতে এলাকাবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন