০৬:৩৮ এম
ইরানের কট্টরপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে গোপনে নিজেদের গোয়েন্দা সম্পদ হিসেবে তৈরি করেছিল ইসরাইল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে আহমাদিনেজাদকে ইরানের নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় বসানো।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনগুলোতে আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরে একটি মোসাদের সেফ হাউজে নিয়ে যাওয়ার নাটকীয় চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
একসময় ইসরাইলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুমকি দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ত্বরান্বিত করা আহমাদিনেজাদকে নিজেদের পক্ষে টানতে দীর্ঘদিন ধরে গোপন অভিযান চালিয়ে আসছিল ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, এই অভিযানের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে বুদাপেস্টের লুদোভিকা ইউনিভার্সিটিতে একটি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি জানিয়েছেন, হাঙ্গেরি সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার অনুরোধে তিনি আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানান, যা মূলত ছিল মোসাদের সাথে আহমাদিনেজাদের গোপন বৈঠকের একটি ছদ্মবেশ বা ‘ফ্রন্ট’। সেখানে মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়া স্বয়ং আহমাদিনেজাদের সাথে দেখা করেন এবং পরবর্তীতে সিআইএকে এই যোগাযোগের বিষয়টি অবহিত করা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইল গোপনে আহমাদিনেজাদের আবাসন ও বিদেশ ভ্রমণের খরচ জোগাত এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তার সাথে গুয়াতেমালা ও হাঙ্গেরিতে একাধিকবার বৈঠক করেন। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ নেয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে কড়া নজরদারিতে থাকা আহমাদিনেজাদের বাসভবনে ইসরাইলি বিমান হামলা চালানো হয়। তবে হামলাটি ছিল মূলত একটি নাটকীয় উদ্ধারের অংশ। হামলা স্থলের বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি কালো পিউজো গাড়ি এসে আহমাদিনেজাদকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যায়। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন মোসাদের এজেন্টরা, যারা তাকে ইরানের ভেতরেই একটি গোপন সেফ হাউজে নিয়ে যান।
তবে এই হঠকারী উদ্ধার অভিযানে আহমাদিনেজাদ ক্ষুব্ধ হন এবং ইসরাইলের সহায়তায় ক্ষমতায় ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তার মোহভঙ্গ হয়। পরবর্তীতে তিনি কীভাবে সেই সেফ হাউজ ছাড়েন তা স্পষ্ট নয়।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আহমাদিনেজাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মতে, তিনি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার ওপর চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে পর পর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ব্যবস্থার অধীনে তিনি আর ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন না।
তিনি ঘনিষ্ঠ মহলে বলতেন, যুদ্ধ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি বাইরের কোনো নির্বাসিত নেতাকে এনে বসায় তবে ইরান অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। নিজেকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিনের মতো একজন ‘সংস্কারক’ হিসেবে ভাবতেন তিনি।
আহমাদিনেজাদ বিশ্বাস করতেন, তিনি ক্ষমতায় এলে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের আওতায় ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবেন। এই সুযোগটিই লুফে নেয় ইসরাইল। এমনকি ক্ষমতা দখলের এই মহাপরিকল্পার অংশ হিসেবে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তেহরানের দিকে অগ্রসর করার একটি ছকও কাটা হয়েছিল।
ইসরাইলের সাথে এই গোপন আঁতাতের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বর্তমানে চরম সংকটে পড়েছেন সাবেক এই ইরানি প্রেসিডেন্ট। গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিন তিনি জনসমক্ষে আসেননি। ৯০ ডিগ্রি প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ভারী জ্যাকেট এবং মুখে মাস্ক পরা অবস্থায় অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
চারজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে ইসরাইলের সাথে যোগাযোগের সমস্ত তথ্য ফাঁস হওয়ার পর মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে বর্তমানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের গোয়েন্দা শাখা গ্রেফতার করে গৃহবন্দি করে রেখেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন