০৫:২২ পি.এম
বাংলাদেশি শ্রমিকেরা রাশিয়ায় যুদ্ধে আহত হয়ে দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন। লক্ষ্মীপুর জেলার ৩১ বছর বয়সী মাকসুদুর রহমানের কাছে যখন একজন দালাল কাজের প্রস্তাব নিয়ে আসেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতে হবে। লক্ষ্মীপুরের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই কেউ না কেউ বিদেশে কর্মরত, তাই বিষয়টি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের তথ্যানুসারে, তিনি ১২ লক্ষ টাকা (প্রায় ৯,৮০০ মার্কিন ডলার) ঋণ করে দালালকে দেন। সাধারণ পরিবারের জন্য এটি একটি বিরাট অংকের অর্থ, তবে প্রতিশ্রুত বেতনের তুলনায় ঋণের বোঝা শোধ করা সম্ভব বলেই মনে হয়েছিল। তিনি চুক্তিতে সই করে বিমানে উঠলেন।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ঝাড়ু বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের কোনো চিহ্নই ছিল না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যান। তাকে এবং আরও তিন বাংলাদেশি শ্রমিককে রুশ ভাষায় লেখা একটি কাগজে সই করতে বলা হয়, যে ভাষা তাদের কারোরই জানা ছিল না। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি সেনা ক্যাম্পে, যেখানে ড্রোন পরিচালনা, আহতদের উদ্ধার এবং ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রহমান প্রতিবাদ জানালে একজন রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে জানান যে, তার নিজের দালালই তাকে এখানে পাঠিয়েছে। রহমানের দলের শ্রমিকদের ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হয় এবং মারধর করা হয়।
তার এই গল্পটি একটি সুসংগঠিত যুদ্ধ ফাঁদের জলজ্যান্ত উদাহরণ: স্থানীয় দালাল, ঋণের বোঝা, কেউ পড়তে পারে না এমন একটি চুক্তিপত্র এবং একটি যুদ্ধ—যা কখনো আলোচনার অংশই ছিল না। তবে লক্ষ্মীপুরের একজন মানুষ কীভাবে সেই ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছালেন তা বুঝতে হলে রাশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং এই নিয়োগ ফাঁদের পেছনের কারণগুলো জানা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা হ্রাসের পেছনে কারণগুলো বিশ্লেষণ
লোকবলের সংকটে রাশিয়া
রাশিয়ায় চরম সেনা সংকট দেখা দিয়েছে এবং পরিসংখ্যানে তা স্পষ্ট। ইউক্রেনীয় গণমাধ্যম কর্তৃক প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চুক্তিবদ্ধ সামরিক সেবায় যোগদানের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মস্কো সাইনিং বোনাস হিসেবে ৮০,০০০ ডলার পর্যন্ত এবং ১,৪০,০০০ ডলার পর্যন্ত ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেওয়ার সত্ত্বেও এই ঘাটতি রয়ে গেছে।
এদিকে, স্থানীয় শোকসংবাদের ওপর ভিত্তি করে বিবিসি এবং মিডিয়াজোনার সাংবাদিকদের অনুমান, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিন লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছে। অন্যান্য পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার মতে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি এবং প্রতি মাসে নিহতের সংখ্যা ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০।
এক হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার শ্রমবাজার স্থিতিশীল করতে আরও ১৫ লাখ শ্রমিকের প্রয়োজন এবং দেশটির কর্মকর্তারা নিজেরাও ২০৩০ সালের মধ্যে ৩১ লাখ শ্রমিকের ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছেন। কঠোর অভিবাসন নিয়মের কারণে প্রায় ১০ লাখ অস্থায়ী শ্রমিক দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় সামরিক বাহিনী এবং কারখানাগুলো এখন একই সংকুচিত শ্রমবাজার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন সিনেটে জিতে ইতিহাস গড়লেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নারী কাওয়াস
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের মতো আরেকটি পূর্ণমাত্রার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আদেশ জারি করার সাহস রাশিয়া পাচ্ছে না, কারণ এটি সরকারের জনসমর্থনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। ফলে কর্মকর্তারা অর্থের বিনিময়ে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ, বয়স্ক ও সেনাক্যাম্পে নিবন্ধন করতে আসা মানুষদের কৌশলে ও বলপ্রয়োগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছেন।
এই ঘাটতি পূরণে মস্কো বিদেশের দিকে নজর দিয়েছে। ইতোমধ্যে তারা হাজার হাজার বন্দি এবং তিন ধাপে উত্তর কোরিয়ার সেনা ব্যবহার করেছে, তবে তা পর্যাপ্ত ছিল না।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি ইউক্রেনীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগার থেকে বন্দি নিয়োগের উৎস হয়তো শেষ হয়ে এসেছে। তাই দেশে নতুন করে গণ-সংগ্রহ এড়াতে রাশিয়া এখন 'গ্লোবাল সাউথ' বা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে লোক সংগ্রহের পরিধি বাড়াচ্ছে।
ইউক্রেনীয় তথ্যানুসারে, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৯,০০০ বিদেশি চুক্তিভিত্তিক সেনাসেবা সই করেছেন। ২০২৬ সালে আরও অন্তত ১৮,৫০০ জন নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার অন্যতম প্রধান টার্গেট হিসেবে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন: চীন আকস্মিক দিক পরিবর্তনকারী ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করল
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই পরিসংখ্যানের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট ছক দেখতে পাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস (এফআইডিএইচ) তিনটি মহাদেশ জুড়ে অবৈধ অভিবাসী, বন্দি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিক এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা একটি সুসংগঠিত চক্রের বিবরণ দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও গত মাসে মস্কোর বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক, বলপ্রয়োগমূলক ও শোষণমূলক নিয়োগের অভিযোগ এনেছে।
এই প্রস্তাব কারা গ্রহণ করছে?
দক্ষিণ এশিয়ায় এই নিয়োগ চক্র কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং নেপালের মন্দার পর রাশিয়ায় মাসে অন্তত ৫৫০ ডলারের বেতনকে অনেকে বেঁচে থাকার পথ হিসেবে দেখেন। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, ২০০ জনেরও বেশি নেপালি নাগরিককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ইউক্রেনে বহু নেপালি প্রাণ হারানোর পর কাঠমান্ডু রাশিয়ায় কাজের অনুমতি দেওয়া স্থগিত করে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার আনুমানিক ৬০০ থেকে ৭০০ জন প্রাক্তন সেনাসদস্য এতে যোগ দেন।
তাহলে এই ঝুঁকি মানুষ কেন নিচ্ছেন? প্রথম কারণ অর্থ। বেঁচে ফেরাদের বিবরণভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ওয়েল্ডারকে ২০,৯৯০ ডলার সাইনিং বোনাস, মাসে ২,৬৬৪ ডলার বেতন এবং নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ঋণে ডুবে থাকা পরিবারগুলোর কাছে এই অর্থের অংক জীবনঝুঁকির ভয়কেও আড়াল করে দেয়।
আরও পড়ুন: ব্যাংকক বিমানবন্দরের ট্যাক্সিওয়েতে আটকে গেল এমিরেটসের বিশাল এয়ারবাস এ৩৮০
তবে কেবল অর্থই একমাত্র কারণ নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কিছু বাংলাদেশি জেনেশুনেই যোগ দিলেও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। আবার কেউ কেউ ভিসাভিত্তিক চাকরি হারিয়ে দালালের লোভনীয় চুক্তির ফাঁদে পড়েছেন। অনেকে এমনকি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনাও হননি—এক বন্দি জানান, এক উজবেক দালাল তাকে ইতালিতে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে পাঠায়। ফোরটিফাই রাইট এবং ট্রুথ হাউন্ডস-এর মতে, একবার ভেতরে ঢুকে পড়লে পছন্দের আর কোনো সুযোগ থাকে না; রুশ ভাষায় চুক্তিপত্র সামনে দেওয়া হয় এবং দ্বিধা করলেই আসে হুমকি ও নির্যাতন। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে পৌঁছানোর পরপরই পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
আইনি চুক্তিহীন শ্রমপ্রবাহ
রাশিয়া কখনোই বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রচলিত কোনো গন্তব্য ছিল না। যুদ্ধের কারণে যখন অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে টান পড়ে, তখন শিপইয়ার্ডে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তায় প্রথম এই দেশে কর্মী যাওয়া শুরু হয়। শুরুতে প্রায় ৫৬ জন শ্রমিককে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৯৯৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৪,৬৬৩ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসেবে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৮,২৪৭ জন কর্মী দেশটিতে গেছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল মাত্র ৪২৬ জন কর্মী পাঠিয়েছিল এবং তারা সেখানে নিরাপদ রয়েছেন; বাকি বিশাল অংশই গেছে বেসরকারি বা দালাল চক্রের মাধ্যমে।
এত বড় অঙ্কের শ্রমপ্রবাহ সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রম চুক্তি নেই। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মস্কো সফরকালে উভয় পক্ষ কেবল ঝুলে থাকা চুক্তিগুলো—যেমন মানবসম্পদ চুক্তি ও প্রত্যাবর্তন চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের আহ্বান জানান। এক বছরের মধ্যে ১,০০,০০০ বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়ার প্রস্তাব দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে রাশিয়া সম্মত হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রী এমনকি পাঁচ বছরে ৩ থেকে ৪ লাখ শ্রমিক পাঠানোর কথা বলেছেন। এর মধ্যেই মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশি নাগরিকদের সামরিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য রাশিয়াকে অনুরোধ জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: রজার্সের কৌশল ব্যর্থ, ৬০ শতাংশ ইহুদি ভোট এল-সায়েদের পক্ষে
আনুষ্ঠানিক চুক্তির অভাব বাংলাদেশি শ্রমিকদের অরক্ষিত ও প্রতারণার মুখে ফেলে দিয়েছে।
যুদ্ধের বাইরেও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চাকরিচ্যুত হয়ে ৩৫ জন শ্রমিক রাশিয়া থেকে ফেরত আসেন, যাদের প্রত্যেকে প্রায় ৭,০০,০০০ টাকা (প্রায় ৫,৬৫১ ডলার) করে দিয়েছিলেন।
দালাল, এজেন্সি এবং টিকিটের মূল্য
গ্রাম থেকে সামরিক ব্যারাকের এই পথটি সাধারণ কিছু অফিসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, ২০২৬ সালের মে মাসে যে ৩০ জন ব্যক্তি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন, তারা জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল এবং টিএস গ্রুপ নামক তিনটি জনশক্তি এজেন্সির মাধ্যমে যান। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশ দুজন মূল হোতাকে গ্রেফতার করে এবং জানায় যে এক রুশ পুরুষ এবং এক কির্গিজ নারী এই চক্রের সাথে জড়িত, যদিও এই অভিযোগগুলো এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী সংসদে জানান, ওই ব্যক্তিরা বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির মাধ্যমেই গেছেন—যা প্রমাণ করে যে কেবল কাগজের অনুমোদনই সব সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না।
আরও পড়ুন: যেসব কৌশলে আরো শক্তিশালী হচ্ছেন শি জিনপিং
তারা পৌঁছানোর পরই পুরনো চিত্র রিপিট হয়—পাসপোর্ট ও ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফ্রন্টলাইনে। তদন্তকারীরা জানান, ড্রোনের সামনে শত্রুপক্ষের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য এদেরকে 'টোপ' হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
লাশের সঠিক হিসাব মেলা ভার
ইউক্রেনীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ফোরটিফাই রাইটস এবং ট্রুথ হাউন্ডস জানায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশি যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। তবে তারা সতর্ক করেছে যে আসল সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর এসআরবি জানায়, ওই ৩০ জনের দলের মধ্যে ২০ জনই মারা গেছেন—যার মধ্যে ১৭ জন ফ্রন্টলাইনে পৌঁছানোর প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন এবং ৬ জন এখনও লড়াই করছেন।
এই তথ্যগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে কারণ তথ্যের উৎস ভিন্ন: পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা এবং কিয়েভ। আর ওদিকে স্বজনেরা দেহ ছাড়াই দিন গুনছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো ঢাকাকে এই দালাল চক্র ভেঙে দেওয়ার এবং ইউক্রেনকে বন্দী আন্তর্জাতিক যোদ্ধাদের মানবপাচারের শিকার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। তবুও পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছে এবং জাতীয় দৈনিকগুলো আটকে পড়া মানুষদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের ভাগ্যে অধরা বিচার
পুনরায় মাকসুদুর রহমানের কথায় আসা যাক: তিনি কোনোক্রমে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছেন। আজ তিনি লক্ষ্মীপুরের নিজ বাড়িতে বসে আছেন এবং হাতে ধরে আছেন একটি রুশ সামরিক ডগ ট্যাগ—যা তার সেখানে থাকার এক জ্যান্ত প্রমাণ। কিন্তু একই অঞ্চলের অনেকেই ফিরতে পারেননি। ২০ বছরের তরুণ সাজ্জাদকে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার পর হত্যা করা হয়। তার বাবা মোহাম্মদ সিরাজ এখন ছেলের একটি ছবি আঁকড়ে ধরে আছেন। সিরাজের কাছে 'বিচার' কোনো কথার কথা নয়—এটি একটি চার্জশিটে থাকা নাম, দাফনের জন্য এক খণ্ড মরদেহ এবং তার ছেলেকে যারা যুদ্ধে পাঠাল তাদের জবাবদিহিতা।
গ্রামে স্বজনেরা দালালদের মুখোমুখি হয়ে জানতে চাইছেন, কেন তাদের প্রিয়জনদের যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। এই প্রশ্নগুলোর স্থান কোনো গ্রামের উঠানে নয়, বরং আদালতের কাঠগড়ায়। যে দালালরা এই চাকরি বিক্রি করেছে এবং যে সরকারি ব্যবস্থা তাদের কাগজপত্রের অনুমোদন দিয়েছে—তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনা পর্যন্ত এই পরিবারগুলো এক অশেষ দেনার বোঝা বয়ে বেড়াবে।
রহমানের নেওয়া ঋণ সত্যি ছিল, যুদ্ধটাও বাস্তব ছিল, কেবল ছিল না সেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরিটি। যে মানুষটি জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়েছিলেন, তিনি আজ ফিরেছেন একজন সৈনিকের ডগ ট্যাগ নিয়ে—আর তার বিচার আজও বহু দূরে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন