০৬:৫৭ পি.এম
সড়ক অবরোধ, মিছিল এবং ককটেল-পেট্রল বোমা নিক্ষেপের অভিযোগে মারা যাওয়া চার আওয়ামী লীগ নেতা নিয়ে বরিশালের আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে। অবাস্তব মনে হলেও এ ধরনের একটি আজব অভিযোগ তুলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক জেলা সমন্বয়ক মারজুক আবদুল্লাহ মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ২৪৮ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বহু বছর আগে মারা যাওয়া চার নেতার নাম।
এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর মামলার সত্যতা, উদ্দেশ্য এবং বাদীর সততা নিয়ে তীব্র বিতর্ক এবং চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, এটি কোনো আইনি লড়াই নয়, বরং ‘মামলা বাণিজ্য’ এবং চাঁদাবাজির নতুন ফাঁদ।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই নালিশি মামলাটি দায়ের করেন মারজুক আবদুল্লাহ। অভিযোগটি আমলে নিয়ে বিচারক এস এম শরীয়ত উল্লাহ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: বরিশালে গ্রাম পুলিশকে শক্তিশালী করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ
আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার জানিয়েছেন, মামলায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং হত্যার হুমকির মত মারাত্মক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার আসামির তালিকায় সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজসহ হেভিওয়েট নেতাদের নাম রয়েছে।
মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ জুন বরিশাল নগরীর গড়িয়ারপার এলাকায় আওয়ামী লীগের ব্যানারে আসামিরা সশস্ত্র মিছিল করেন এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসামির তালিকায় থাকা চারজন নেতা বহু আগে মারা গেছেন।
খন্দকার রেজাউর রহমান রেজা (আসামি নং ২১২): ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এই সাবেক সভাপতি মারা গেছেন ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি।
আবুল ফারুক হুমায়ুন (আসামি নং ১৯৮): ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এই সাবেক সভাপতি মারা গেছেন ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ।
আরও পড়ুন: বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে নেতাকর্মীদের থাকার আহ্বান চিফ হুইপের
এইচ এম হাফিজুর রশীদ শিবলী (আসামি নং ২২৫): ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদক মারা গেছেন ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর।
মোহাম্মদ আলী হাওলাদার (আসামি নং ১৯৫): ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদক মারা গেছেন ২০২১ সালের ২৬ জুলাই।
এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বরিশাল সিটির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রাজীব হোসেন খান মন্তব্য করেন, "মারজুককে বরিশালের সবাই 'মামলা ব্যবসায়ী' হিসেবে চেনে। যারা মারা গেছেন, তাদের প্রত্যেকের জানাজায় আমি ছিলাম। মৃত মানুষ কীভাবে এসে ককটেল মারবে? এই মামলা যে সম্পূর্ণ ভুয়া ও সাজানো, তা এই চার মৃত আসামির নাম দেখেই প্রমাণিত হয়।"
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাদী মারজুক আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্ন শুনেই লাইন কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিক কল করলে তিনি রিসিভ করেননি।
আরও পড়ুন: মহানগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন রাসিক প্রশাসক রিটন
শুক্রবার বিকেলে তিনি নিজেই ফোন করে অন্যান্যদের দায় চাপান সাক্ষীদের ওপর। মারজুক দাবি করেন, "রেজা নামের যে ব্যক্তির নাম এসেছে, সেটি সাক্ষীদের ভুলের কারণে হয়েছে। বাকি তিনজনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। সাক্ষীদের ভুল তথ্যের কারণেই এমনটা ঘটেছে।"
এছাড়াও জানা গেছে, মারজুক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে মামলার মাধ্যমে চাঁদাবাজির অভিযোগ এই প্রথম নয়। বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা মারজুক এর আগে ২০২৫ সালের ১৪ মে আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুসহ ২৪৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।
সে সময় আসামির তালিকায় নাম রাখা ও বাদ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাই সংবাদ সম্মেলন করে মারজুকের এই 'মামলা বাণিজ্যের' তথ্য ফাঁস করার পর তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার ও পদ স্থগিত করা হয়েছিল।
বরিশালের বিশিষ্ট গবেষক আনিসুর রহমান খান স্বপন এই ঘটনাকে বিচার ব্যবস্থার অবমাননা উল্লেখ করে বলেন, "মামলায় মৃত ব্যক্তিদের আসামি করা আদালতকে বিভ্রান্ত করার শামিল। বিষয়টিতে পুলিশ প্রশাসনের স্ব-প্রণোদিত হয়ে তদন্ত করা উচিত এবং বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।"
আরও পড়ুন: রাঙামাটিতে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা
বরিশাল আদালতের সিনিয়র আইনজীবী মেহেদী হাসান বলেন, "তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মৃতদের আসামি করা হয়েছে, তবে আদালত বাদী ও সাক্ষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন