০৬:২৭ পি.এম
ফ্রান্সে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের ঊর্ধ্বগতির সুদ এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মধ্য-ডানপন্থী সরকারের প্রতি গণঅসন্তোষকে আরও তীব্র করে তুলছে। তবে, দেশটিতে যে ব্যাপক দাঙ্গা শুরু হয়েছে, তা মূলত স্কুলগুলোতে অপর্যাপ্ত অর্থায়নের প্রতিবাদ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা পরে শ্রমিক ও পেনশনভোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মূলত উদার গণতন্ত্রের মাধ্যমে উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা হতাশার প্রতিফলন।
শুধু ফ্রান্স নয়, সমগ্র ইউরোপের রাজনৈতিক স্থিতি নড়বড়ে হয়ে উঠছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভের ফলে ঘটছে। শীর্ষ দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো গভীর সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ ও জনতাবাদী আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হচ্ছে, যেখানে উগ্র ডানপন্থী এবং উগ্র বামপন্থী উভয় ধারার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অনেক ইউরোপীয় নাগরিক মনে করেন, প্রথাগত মধ্য-বাম ও মধ্য-ডানপন্থী দলগুলো মূলত অভিজাত শ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এবং সাধারণ শ্রমিক, দরিদ্র মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ নেই। এছাড়া, ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সুদের হার বৃদ্ধি সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘জয় বাংলা’ স্লোগান গ্রহণ করে রাজ্যকে বৃহত্তর বাংলাদেশে পরিণত করতে চেয়েছিল তৃণমূল
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ দারন আজেমোহু তাঁর ‘উদার গণতন্ত্রের কী হলো?’ শীর্ষক গ্রন্থে দুটি প্রধান ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, বিশ্বায়ন ও বৈষম্যের যুগে সবার জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া। দ্বিতীয়ত, শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ‘উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া’ সাংস্কৃতিক রাজনীতির উত্থান। তাঁর বক্তব্য, “উদারনীতিবাদকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হলে শ্রমজীবী শ্রেণিকে এর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।”
জার্মানির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই কেন্দ্রিক রাজনীতির ভাঙনের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেখানে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ), ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিএসইউ) এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) মতো দলগুলো তাদের জনসমর্থন হারাচ্ছে। এর বিপরীতে উগ্র ডানপন্থী দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) এবং বামপন্থী দল ‘দি লিঙ্কে’ শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
একসময় সিডিইউ-এর অনুগত শ্রমিক শ্রেণির ভোটাররা এখন এএফডি-এর দিকে ঝুঁকেছে, অন্যদিকে এসপিডি তাদের ঐতিহ্যবাহী সমর্থকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জনমত জরিপের গড় অনুযায়ী, বর্তমানে এএফডি-র সমর্থন ২৮ শতাংশ, সিডিইউ/সিএসইউ-এর ১৯.৮ শতাংশ, গ্রিন পার্টির ১৫ শতাংশ, এসপিডি-র ১৩.১ শতাংশ এবং দি লিঙ্কে-র সমর্থন ১১.৩ শতাংশ। ফ্রান্সেও ভোটাররা মেরিন লু পেনের নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র্যালি’ এবং জ্যঁ-লুক মেলেশোঁর নেতৃত্বাধীন উগ্র বামপন্থী দল ‘ফ্রঁস আঁসুমিজ’-এর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, যা আগামী বছর স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনগুলো নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন সাবেক জেনারেল রবার্তো ভানাক্কি, যিনি মেলোনির চেয়েও কট্টর ডানপন্থী অবস্থানে রয়েছেন। এইচইসি প্যারিসের ইউরোপীয় আইনের অধ্যাপক আলবার্তো আলেমানো সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন যে, চেক প্রজাতন্ত্র, ফিনল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সরকারে কট্টর ডানপন্থী দলগুলো অংশীদার হিসেবে রয়েছে; এছাড়া স্লোভেনিয়ার সরকারও একটি কট্টর ডানপন্থী দলের বাইরের সমর্থনের ওপর টিকে রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জনমত জরিপে গণতন্ত্র নিয়ে অসন্তোষের হার ফ্রান্সে ৬৯ শতাংশ, স্পেনে ৬৮ শতাংশ, ইতালিতে ৬২ শতাংশ, পোল্যান্ডে ৪৭ শতাংশ এবং আমেরিকাতে ৬৯ শতাংশ।
আরও পড়ুন: জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুও ফুকুদা টোকিওতে মারা গেছেন
‘আমেরিকান কাউন্সিল অন জার্মানি’-এর প্রেসিডেন্ট স্টিভেন ই. স্কোল বলেন, “এই সব দেশের ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—এমন কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেদের পিছিয়ে পড়া বলে মনে করেন; যারা মনে করেন, তাদের চারপাশে যে সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বিরাজ করছে, তার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।” বুলগেরিয়ার ‘সেন্টার ফর লিবারেল স্ট্র্যাটেজিস’-এর চেয়ারম্যান এবং ভিয়েনার ‘ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সায়েন্সেস’-এর ফেলো ইভান ক্রাস্তেভ সতর্ক করে বলেছেন, “চারটি বড় নির্বাচন সামনে এবং কট্টর ডানপন্থীদের প্রভাব বাড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপ একটি বড় পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সরকারগুলো খণ্ডিত বা বিভক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ছোট ছোট কট্টর ডানপন্থী দলগুলো মূলধারার ডানপন্থী জোটগুলোকে জিম্মি করে ফেলতে পারে এবং মধ্যপন্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ইভান সতর্ক করে বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সচল রাখার খাতিরে এই দলগুলোকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য করে তোলার যে কোনো প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।” সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন