১০:৪০ পি.এম
সরকারের প্রথম ১০০ দিন সাধারণত কোনো একজন মন্ত্রীর কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য একটি প্রাথমিক সূচক হিসেবে ধরা হয়। সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং জনসেবা সম্পর্কিত নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা কেমন হলো - এই সব বিষয় বিবেচনা করে প্রাথমিক বিশ্লেষণ করা হয়।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমের মধ্যে কিছু সাফল্য চোখে পড়েছে, কিন্তু দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাও রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে সড়ক খাত কয়েক বছর ধরে যানজট, দুর্ঘটনা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সমালোচিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৫.১ শতাংশ ক্ষতি হয়। তাই নিরাপদ এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে পবিত্র ঈদুল ফিতরের জন্য যাত্রা ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তখন নতুন সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি এবং বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় প্রক্রিয়া চলছিল।
এমন পরিস্থিতিতে কোটি মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখাটা কঠিন ছিল, তবুও আগাম প্রস্তুতি, মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, টোল প্লাজা ও ফেরিঘাটে বিশেষ ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে ঈদুল ফিতরে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এরপর ঈদুল আজহার যাত্রা ব্যবস্থাপনাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা—দুই উৎসবেই মহাসড়ক সচল রাখা ও পদ্মা ও যমুনা সেতুতে বিপুল যানবাহনের নির্বিঘ্ন পারাপার নিশ্চিত করা শেখ রবিউল আলমের প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম বড় অর্জন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাপক ছিল, কোরবানির পশু পরিবহনের ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, হাওর অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী জেলা থেকে লাখ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া দেশের বিভিন্ন হাটে আনা হয়েছিল।
এমন অবস্থায় ভারি যানবাহনের চাপের মধ্যে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি ও হয়রানি প্রতিরোধ, এবং ফেরিঘাট ও সেতুগুলোতে পশুবাহী যানবাহনের অগ্রাধিকারভিত্তিক পারাপারের কারণে বড় ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই পরিবহন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে পদ্মা ও যমুনা সেতুর ঈদকেন্দ্রিক যানবাহন ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২১ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ১০ দিনের মধ্যে পদ্মা সেতু দিয়ে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৫১৫টি যানবাহন পারাপার হয় এবং টোল আদায় হয় ৩৬ কোটি ১১ লাখ ৯৫ হাজার ৯০০ টাকা।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
একই সময়ে যমুনা সেতু দিয়ে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৮২টি যানবাহন চলাচল করে এবং টোল আদায় হয় ২৭ কোটি ৬৮ লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ, দুই সেতুর মালিকানা দিয়ে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে প্রায় ৬৪ কোটি টাকার টোল আদায় হয়েছে।
ঈদযাত্রার সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে পদ্মা সেতু দিয়ে ৪৫ হাজার ৬০২টি যানবাহন পারাপার হয়, যার বিপরীতে ৫ কোটি ৩ লাখ ২৪ হাজার ৪৫০ টাকা টোল আদায় হয়, যা সেতুটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ একদিনের টোল আদায়ের রেকর্ড।
অন্যদিকে, যমুনা সেতুর একই দিনে ৫৬ হাজার ২৩৯টি যানবাহন পারাপার হয়ে ৩ কোটি ৮২ লাখ ৯৭ হাজার ৫০ টাকা টোল আদায় হয়।
শেখ রবিউল আলমের মন্ত্রণালয়ে টোল আদায়ে স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেতুর ডিজিটাল টোল ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণের ফলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। টোল ফাঁকি কমানোর উদ্যোগ এবং ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতাও বেড়েছে।
আরও পড়ুন: আব্বাসউদ্দীনের ভাওয়াইয়া গান নিয়ে উৎসবের আয়োজন করবে সরকার: সংস্কৃতিমন্ত্রী
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু করিডর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং পদ্মা সেতু সংযোগ সড়কে যান চলাচল সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সক্রিয় দেখা গেছে।
যদিও রাজধানীর যানজট এখনো একটি বড় সমস্যা, তবে ঈদের সময় মহাসড়কগুলোতে অতীতের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করছে। তাদের মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আধুনিক ও কার্যকর যোগাযোগ অবকাঠামো অপরিহার্য।
এই বিষয়টি মাথায় রেখে শেখ রবিউল আলম চলমান সড়ক ও সেতু প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজের গতি বেড়েছে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি সন্তোষজনক।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
তবে সড়ক খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখনও দুর্ঘটনা। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন প্রয়োজন। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শুধুমাত্র অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ধরা হচ্ছে ঈদযাত্রা ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি নিশ্চিত করা, পদ্মা ও যমুনা সেতুতে রেকর্ডসংখ্যক যানবাহন পারাপার ও প্রায় ৬৪ কোটি টাকার টোল আদায়, মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া, এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে গতি রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা।
তবে নিরাপদ সড়ক, দুর্ঘটনা হ্রাস, রাজধানীর যানজট সমস্যার সমাধান এবং গণপরিবহন খাতে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে শেখ রবিউল আলমের পারফরম্যান্সকে ‘আশাব্যঞ্জক সূচনা’ বলা যায়।
আরও পড়ুন: সাঈদীর মামলার বাদীকে দাফনে বাধা দেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন জামায়াতের
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন