০৭:৪১ পি.এম
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়; বিষয়টিকে ঘুরিয়ে দেখার কোনো সুযোগ নেই। দিল্লি পুলিশ, যা দেশের রাজধানী হলেও, একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা হিসেবেই পরিচিত। সাংবাদিকদের জন্য কোনো আচরণবিধি, পরিচালন নীতি বা প্রেস নির্দেশিকা জারি করার মতো তাদের কোনো আইনি বা সংবিধিবদ্ধ অধিকার নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ (সাবেক টুইটার) দিল্লি পুলিশের একটি পোস্টে, যেখানে একজন রিপোটারকে পুলিশ কর্মকর্তার মুখের সামনে মাইক ধরে রাখার একটি ছবি এঁকে (সাংবাদিকতার নীতিশাস্ত্র) নিয়ে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তা বিভিন্ন দিক থেকেই সমস্যা তৈরি করেছে। এটি সাধারণ কোনো 'নিরাপত্তা বিষয়ক সতর্কতা' নয়। যন্তর মন্তরে একটি বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় দিল্লি পুলিশের সদস্যরা নারী সাংবাদিকদের শ্লীলতাহানি ও শারীরিক নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ তোলার পর এই পোস্টটি প্রকাশিত হয়।
অভিযোগ অনুসন্ধানের পরিবর্তে, এটি মূলত অভিযোগকারী সাংবাদিক ও তাঁদের পেশার ওপর উল্টো নিয়ম চাপিয়ে পুলিশের নিজেদের অপরাধ ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা। পুলিশ পোস্টটিকে "নির্দেশিকা" এবং "পরামর্শ" হিসেবে উপস্থাপন করলেও, এর মূল উদ্দেশ্য হলো মূল ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে পরিস্থিতির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া, ব্যঙ্গাত্মক পাল্টা 'পুলিশের নির্দেশিকা' এবং পুলিশের অপকর্মকে সুরক্ষা দেওয়ার নানা অভিযোগে এটি স্পষ্ট যে, তাদের এই কৌশল ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। দিল্লি পুলিশের সেই 'এক্স' পোস্টে যেসব মারাত্মক গলদ রয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
আরও পড়ুন: ‘বর্তমান নিয়ন্ত্রণরেখায় যুদ্ধ স্থগিতে সম্মত ইউক্রেন’
এক পোস্টে সংবাদ সেন্সরশিপ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না দিল্লি পুলিশ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় পুলিশ বাহিনী গণমাধ্যমের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, যার মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও অন্তর্ভুক্ত। কোনো জনবিক্ষোভের ঘটনা কভার করা, ছবি বা ভিডিও রেকর্ড করা, কিংবা তা প্রচার করার জন্য সাংবাদিককে অবশ্যই পিআইবি অ্যাক্রেডিটেশন বা কোনো স্বীকৃত গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক কার্ডধারী হতে হবে—এমন কোনো বাধ্যতামূলক আইনি নিয়ম নেই। দিল্লি পুলিশ যেহেতু সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন পরিচালিত হয়, তাই তাদের এই ধরনের বার্তা মোদী প্রশাসনের একটি অন্যায্য ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার প্রদর্শন। এটি মূল সংবিধান-স্বীকৃত একটি স্বাধীন পেশাকে পুলিশের নির্দেশ জারি করে নিয়ন্ত্রণের শামিল। গণবিক্ষোভ, গ্রেপ্তার বা রাষ্ট্রের বল প্রয়োগের ঘটনাগুলোতে যখন সবচেয়ে বেশি নজরদারি প্রয়োজন, ঠিক তখনই সংবাদপত্রের এই স্বাধীনতাকে খর্ব করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সাংবাদিকদের ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো—শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা বেআইনি আটকের ঘটনা নথিভুক্ত করার পথ রুদ্ধ করা।
এটি মূলত ভুক্তভোগীকে দোষারোপ ও তথ্য গোপনের অপচেষ্টা। মূল বিষয়টি ছিল দিল্লি পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নারী সাংবাদিকদের শ্লীলতাহানি ও আক্রমণের অভিযোগ। পুলিশ যদিও দাবি করেছে যে অভিযোগটি ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে, তবুও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, প্রমাণের সংরক্ষণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত না করে, তারা উল্টো সাংবাদিকদের নীতিশাস্ত্রের পাঠ দেওয়া শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি ব্যবহার করে পুলিশকে 'শান্ত ও নিপীড়িত' এবং সাংবাদিকদের 'আক্রমণাত্মক' হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের অপরাধ আড়াল করার একটি পক্ষপাতদুষ্ট গল্প তৈরি করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের উগ্র হিসেবে চিহ্নিত করা এবং নীতি শেখানোর মাধ্যমে জনদৃষ্টি মূল ঘটনা থেকে সরানোর একটি চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে সাংবাদিকদের অবস্থান বা কাজের কারণেই যেন পুলিশ এমন আচরণ করতে বাধ্য হয়েছে। অথচ সাংবাদিকদের কাজের ধরণ বা দূরত্বের দোহাই দিয়ে কখনোই যৌন হয়রানি, আক্রমণ বা বেআইনি বাধা প্রদানকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করা যায় না।
সংবাদ সংগ্রহের সাংবিধানিক গুরুত্ব খর্বের অপচেষ্টা। সংবাদ প্রকাশ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তা সংগ্রহের স্বাধীনতা। পুলিশ যদি বলপ্রয়োগের সময় ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের দূরে সরিয়ে দেয়, তবে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রেস ফ্রিডমের মূল বিষয় হলো তথ্য ও এর উৎসের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সাংবাদিকদের বিক্ষোভকারীদের থেকে আলাদা পোশাকে চিহ্নিত হওয়ার শর্ত দিয়ে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্র যদি ঠিক করে দেয় তাকে কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, তবে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ভিত্তিই নষ্ট হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর তুরস্কের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত
পরিচয়পত্র বনাম অনুমতিপত্র: একটি বিপজ্জনক গুলিয়ে ফেলা। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কার্যকারিতার জন্য পরিচয়পত্র বহন সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কেবল একটি নির্দিষ্ট 'বৈধ' সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্রকেই সাংবাদিকতার একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে ফেললে ফ্রিল্যান্সার, ফ্রিল্যান্স ডকুমেন্টারি নির্মাতা, শিক্ষানবিস বা নাগরিক সাংবাদিকরা বাদ পড়ে যাবেন। সংবিধান প্রদত্ত প্রেস ফ্রিডম সাধারণ নাগরিকের অধিকার, শুধু কোনো সরকার-স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমের নয়।
অস্পষ্ট ও বিপজ্জনক সীমানা
"বাধা দেবেন না", "নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন" কিংবা "স্পষ্টভাবে নিজেকে আলাদা করুন"—এই কথাগুলোর কোনো নির্দিষ্ট আইনি বা সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। আন্দোলন বা বিক্ষোভের সময় পুলিশ নিজেদের সুবিধামতো এই অস্পষ্ট শব্দের অজুহাত দেখিয়ে সাংবাদিকদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট আইনগত অনুমোদন ছাড়া সাংবাদিকরা কোথায় দাঁড়াবেন তা পুলিশ এককভাবে নির্ধারণ করলে রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জনসমক্ষে জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
পুলিশের জন্য নেই কোনো নিজস্ব আচরণবিধি (এসওপি)। পুলিশের এই 'এক্স' আপডেটে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি যে—তারা সাংবাদিকদের ডিভাইস বা ফোন কেড়ে নেবে না, ফুটেজ ডিলিট করবে না কিংবা সাংবাদিকদের তথ্য সরবরাহের উৎস প্রকাশে বাধ্য করবে না। পুলিশ কীভাবে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেবে—তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখানে নেই। নেই কোনো প্রেস লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ বা দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির কোনো ব্যবস্থা।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প-রুবিওর নীরবতা ইসরাইলকে বেপরোয়া করছে: মার্কিন সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন
মোদী ও অমিত শাহ কি এ বিষয়ে নীরব? দিল্লি পুলিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয় এবং পুলিশ কমিশনার সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি করেন। ফলে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই বিভাগের প্রধান হিসেবে সরাসরি দায়িত্বশীল এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীরও নীতিগত দিক থেকে হস্তক্ষেপ করা উচিত। অমিত শাহের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল হয়রানির অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তা না করে পুলিশ যদি সাংবাদিকতার ওপর সেন্সরশিপ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে ধরে নিতে হবে সাধারণ মানুষের রাজপথের আন্দোলন ঠেকানোর ব্যর্থতা ঢাকতেই এই ধরনের নজিরবিহীন দমনপীড়নের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন