১২:৩৯ এম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে মাহামুদুর রহমান সৈকতের মাথার এক পাশে গুলি প্রবেশ করে এবং অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। শহীদ ভাইয়ের হত্যার মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী এই ভীতিকর ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে তিনি ভাইয়ের পাশে আরও পাঁচটি লাশ দেখতে পান, যাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন ছিল।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তার সাক্ষ্য রেকর্ড করেন।
মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার নবম সাক্ষী হিসেবে সেবন্তী সাক্ষ্য দেন। তিনি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে মোহাম্মদপুরে বসবাস করছেন। সেবন্তী বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের বোন। তার ভাই সৈকত ২০২৪ সালের ৭ জুলাই মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোডে পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন।
আরও পড়ুন: কাজের সময় হঠাৎ লুটিয়ে পড়লেন পোশাক শ্রমিক, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল খারাপ আচরণ
সেবন্তী তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন যে, ১৮ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের জন্য সৈকত প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু তাকে বাধা দেন তার মা। একই দিন বিকেলে, মাকে না জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে বন্ধু মো: আরাফাত হোসেনের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন সৈকত। পরে মাকে ফোন করে বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে বলেন, কারণ আশপাশে পুলিশ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিলেন। তখন সৈকতকে ধমক দিয়ে বাসায় ফিরে আসতে বলেন তার মা। ওই রাতে ফেসবুকে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের খালার একটি পোস্ট ভাইরাল হয়, যেখানে লেখা ছিল ফারহান ফাইয়াজ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। এই পোস্ট দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সৈকত।
১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে সৈকত নূরজাহান রোডের দক্ষিণ মাথায় স্টেপ জুতার দোকানের সামনে আন্দোলনে যোগ দিতে বাসা থেকে বের হন। তাকে বারবার মোবাইল ফোনে কল করেন তার মা। সেই সময় তিনি বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে ছিলেন। কল করার পর সৈকত ফোনটি রিসিভ করেন। ফোনে ধমক দিয়ে তাকে বাসায় ফিরে আসতে বলেন। তার সঙ্গে শেষ কথা হয় ৩টা ২৬ মিনিটে। তখন তার বাবা বারবার তাকে কল করছিলেন। এক সহযোদ্ধা ফোনটি রিসিভ করে বলেন, ‘এই ফোনটি যার সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। আপনারা দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান, অন্যথায় লাশও পাবেন না।’ দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে মর্গের সামনে স্ট্রেচারে শায়িত অবস্থায় সৈকতের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান তার বাবা ও চাচাতো ভাই সাইফুর রহমান হায়দার কনক। সেবন্তীও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। পথে অনেক জায়গায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশকে গুলি করতে দেখেন। হাসপাতালে গিয়ে তিনি মর্গের ভেতরে তার ভাইয়ের লাশ দেখতে পান। তার পাশেই রাজুরসহ আরও পাঁচটি লাশ ছিল, যাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন ছিল।
তিনি বলেন, শহীদ রাজু মোহাম্মদপুরের একজন আন্দোলনকারী ছিলেন। রাত ৯টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ইসলামে সৈকতের লাশ গোসল করানো হয়। তার লাশটি সেখানেই রেখে দেন। তার ফুফাতো ভাই জানান, বাসার নিচে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান করছিলেন। রাতে কারফিউ জারি হয়। পরদিন বেলা ১১টায় কারফিউ শিথিল থাকায় লাশ বাসায় নিয়ে আসা হয়। এরপর মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
হাসপাতাল থেকে কোনো কাগজপত্র প্রদান করা হয়নি উল্লেখ করে সেবন্তী জানান, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিন পর হাসপাতাল থেকে মৃত্যুসনদ প্রদান করা হয়। এতে লেখা ছিল গান শটে মারা গেছে। ৫ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তার ভাইয়ের মৃত্যুর সনদপত্র আনতে গেলে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পান তিনি। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা, আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশানুল হক সৈকত, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ বজলুর রহমান, আজিজুল হক রানা, এমএ সাত্তার, তৎকালীন কাউন্সিলর আসিফ, কাউন্সিলর রাষ্ট্রন, কাউন্সিলর রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস বিপ্লব, তোফায়েল সিদ্দিক তুহিন, ইসমাইল হোসেন, বিচ্ছু জালাল, মাঈনুল হাসান রাসেল, কেএম ফজলে রাব্বি, সাজ্জাদ হোসেনসহ আরও অনেককে দায়ী করেন সৈকতের বোন। এ সময় তিনি নিজের ভাইসহ জুলাই আন্দোলনে সব হত্যাকাণ্ডের জন্য তাদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।
আরও পড়ুন: বিএডিসিসহ কৃষি ফার্মের শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ ও মজুরি বাড়ানোর দাবি
এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে তারেক আবদুল্লাহ, গাজী এমএইচ তামিম, মঈনুল করিম, মামুনুর রশিদ, সহিদুল ইসলাম, মার্জিনা রায়হান উপস্থিত ছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন