০২:৩২ এম
১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলনের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ এখন পরপারে চলে গেছেন। মহানায়করা অনেকেই হবেন, কিন্তু মহানায়ক খুব বেশি নয়।
সারা দেশের মানুষ তোফায়েল আহমেদকে ’৬৯-এর মহানায়ক হিসেবে চেনে। তবে আমি তাঁকে সেভাবে চিনি না। বরিশাল থেকে তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন ’৬২ সালে স্কাউট জাম্বুরির জন্য। লতিফ ভাই (লতিফ সিদ্দিকী) টাঙ্গাইল থেকে এসেছিলেন। সেই সময় তাঁদের মধ্যে পরিচয় হয়েছিল। এরপর তাঁদের মধ্যে শত শত চিঠি বিনিময় হয়েছিল।
অকস্মাৎ একদিন জানতে পারলো যে ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনে তিনিই নেতা, তখন আনন্দে বুক মন ভরে যায়। বাঙালির মধ্যে কিছু গুণ এবং কিছু ছোটখাটো দোষও আছে। অতীতের অনেক কিছু আমরা ভুলে যেতে চাই, অস্বীকার করতেও চাই।
আরও পড়ুন: ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ পরিবহনে বিপাকে স্বজনরা, রোগীরাও ভোগান্তিতে
যদি তোফায়েল আহমেদ না থাকতেন ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনে, বঙ্গবন্ধুকে যদি পাকিস্তানের কারাগার থেকে বের করে আনতে না পারতেন, বঙ্গবন্ধু যদি ’৬৯-এ মুক্তি না পেতেন এবং আইয়ুব খানের বিদায় না ঘটত, তাহলে আজ বাংলাদেশ হতো না। পাকিস্তানের পর ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৫৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন, ’৬২ সালের শিক্ষা কমিশন—এসব আন্দোলনই মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি তৈরী করেছে। বিশেষ করে ’৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে বের করে আনতে পেরে, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ।
আজ আমি কোনো বিতর্কিত কথায় যেতে চাই না। তোফায়েল আহমেদের জানাজায় উপস্থিত হতে চেয়েছিলাম, শুনেছি আজ সন্ধ্যায় জানাজার আয়োজন হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ব্যর্থতা, বেদনার বিষয়। রক্ষীবাহিনী তোফায়েল আহমেদ দেখাশোনা করতেন, পরে এ বিষয়ে জানলাম। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার আগে কখনো শুনিনি যে মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ রক্ষীবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন।
আমাদের মধ্যে যাঁরা সফল হন এবং বড় ভূমিকা নেন, তাঁদের অনেক মানুষ উপলব্ধি করে, তবে বিপক্ষে অনেক শক্তিও থাকে। তোফায়েল আহমেদও তেমনই একজন ছিলেন। অনেকেই তাঁকে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছিলেন। আমি একটা কথা শুনেছি—রক্ষীবাহিনী তাঁর নির্দেশ চাইতে গিয়েছিল। যুদ্ধে সবসময় নির্দেশের প্রয়োজন হয়না। তোফায়েল আহমেদ যদি নির্দেশ দেন, তাহলে কি রক্ষীবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে? তবে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েনি। আর রক্ষীবাহিনীর অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখাও হয়নি। পিলখানায় তা রাখা হয়েছিল। অন্যের অস্ত্রাগারে অস্ত্র রেখে কোনো যোদ্ধা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেন না।
আমার মতে, বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে নিহত হয়েছেন, অথচ তাঁর সহকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে হত্যার জন্য শত্রুপক্ষ তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল। ’৭৫-এর ঘটনার প্রতিবাদ করতে অনুমতির প্রয়োজন হয়, এটি একটি বানানো কথা।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
সারা বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টিকারী তোফায়েল আহমেদ ’৬৯ সালের তোফায়েল আহমেদ, এবং আমাদের কাছে ’৬২ সালের তোফায়েল আহমেদ। বর্তমান সময়ের কথা বললে আমরা দেখতে পাই, এখন মার্সিডিজে বা পাজেরোতে চড়েন কিন্তু সেদিন পূর্ব পাকিস্তান তোফায়েল আহমেদের হাতে ছিল, তখন আসন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রামেও তাঁরা বাসে করেই টাঙ্গাইলে এসে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আজ যা-ই হোক, বঙ্গবন্ধু তোফায়েলের মতো একজন বড় নেতাকে পেয়েছিলেন, একজন বড় সংগঠককে পেয়েছিলেন। তিনি স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর বন্ধু, কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাকে অনেকদূর নিয়ে গিয়েছিল। আমি অনেক কিছুর সাক্ষী।
একটি ঘটনা জানাই—ভোলার উপনির্বাচনে গিয়েছিলাম। সেখানে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা সাতদিন মতো ছিলেন, আমি প্রায় ১৬ দিন সেখানে ছিলাম। ইসহাক আলি পান্না নামে একজন অসাধারণ ছেলেকে পেয়েছিলাম, যিনি পরে ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন। এই ১৫-১৬ দিনে তোফায়েল আহমেদকে অন্যরকম মানুষ হিসেবে দেখেছি, কর্মীদের থাকা-খাওয়া এবং আমাদের খোঁজখবর নেওয়ার বিষয়ে কোনো ক্লান্তি ছিল না। তাঁর স্ত্রীও মায়ের মতো ছিলেন। অথচ কিছু না হলেও, খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি তোফায়েল আহমেদকে মাফ করে দিয়ে বেহেশত নসিব করুন। সত্যি কথা বলতে, কষ্ট লাগে, যাঁদের জাতীয় সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের অনেকেই তা পাননি। তোফায়েল আহমেদও পাননি। সরকারিভাবে তাঁকে সম্মান দেওয়া হয়নি, দলীয়ভাবেও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আমির হোসেন আমু, যিনি আজ ৯০ বছরের কাছাকাছি বয়সে, তিনি এখন জেলের মধ্যে আছেন। এমএ জলিল, যিনি একজন অসাধারণ মানুষ, তিনিও কোনো সম্মান পাননি। আজ যাঁরা আছেন, এ জাতির তাঁদের প্রতি আরও সম্মান দেখানো উচিত ছিল।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
বীর মহাবীর হওয়ার মৃত্যু অনেকের জীবনে আসে। তবে তোফায়েল আহমেদ ’৬৯-এর মতো মহানায়ক, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও একই শ্রেণীর মহানায়ক। মানুষের মধ্যে অনেক ব্যর্থতা, ভুল এবং ভ্রান্তি থাকে। তবুও আমি মনে করি, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সকল ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে একজন সফল রাজনীতিবিদ।
অনুলিখন : কাজল আর্য, টাঙ্গাইল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন