০৩:৪৫ এম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বলতে বোঝায় শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ, বিশাল ডেটা সেন্টার এবং মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের একচ্ছত্র আধিপত্য। এই ধারণা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে চালু ছিল। কিন্তু এই ধারণায় একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে চীন। ২০২৫ সালের শুরুতে চীনের হাংঝু শহরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপসিক’ একটি রিজনিং-ভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) উন্মোচন করে। এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে নতুন আলোচনার সৃষ্টি করে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ওপেনএআই বা গুগলের তুলনায় অনেক কম খরচে মাত্র ৬০ লাখ মার্কিন ডলারে উক্ত মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি চ্যাটজিপিটি-৪ শ্রেণির মডেলগুলোর কাছাকাছি সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে। কেন এই সাফল্য তাৎপর্যপূর্ণ? বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনটি ঘটেছে ডিপসিকের আবির্ভাবের সময়ে, যখন চীনের প্রযুক্তি খাত মার্কিন চিপ নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস এবং ধীরগতির অর্থনীতির চাপে ছিল। কিন্তু চীন সেই সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে পরিণত করেছে, নতুন এক ‘সাশ্রয়ী’ যুগের সূচনা করেছে। মার্কিন এআই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় ১২ গুণ বেশি চীনের তুলনায়। এই অবস্থায় ডিপসিকের মূল প্রতিষ্ঠান হাই-ফ্লায়ার ভিন্নপথে এগিয়েছে। তারা অযথা অর্থ ব্যয় না করে নির্দিষ্ট ডোমেইনে মনোযোগ দিয়েছে। সাশ্রয়ী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণ করে জ্বালানি দক্ষতার ওপর জোর দিয়েছে। যদিও কিছু সমালোচক এনভিডিয়ার উন্নত চিপ ব্যবহার বা গোপন অর্থায়নের বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন। দুই দেশের ভিন্ন পথের দৌড়ের বিষয়ে বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং দেশে সফটওয়্যার খাতে সীমিত ব্যয়ের সংস্কৃতি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম খরচে সর্বোচ্চ ফল দেয়ার প্রযুক্তি তৈরিতে বাধ্য করেছে। বিনিয়োগ ও কৌশলগত পরামর্শভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সোল ক্যাপিটালের হেরি হ্যানের মতে, গভীর প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে তাই চি দর্শনের ইয়িন-ইয়াং প্রতীকের দুটি দিক হিসেবে দেখতে হবে। দুই দেশেরই ভিন্ন শক্তি রয়েছে, আর সেই শক্তিই একে অপরকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করছে। বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এআই উন্নয়ন বিপুল বিনিয়োগনির্ভর পথে এগোচ্ছে। বিশাল ডেটা সেন্টার, উচ্চ ব্যয়ের গবেষণা এবং শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (এজিআই) ও উন্নত স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট তৈরির দিকে এগোচ্ছে। যা ভবিষ্যতে মানুষের মতো পরিকল্পনা করে স্বাধীনভাবে জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারবে। চীনের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন। তুলনামূলক সীমিত পুঁজি, উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামোয় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং ছোট অভ্যন্তরীণ বাজারের বাস্তবতায় দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো কম খরচে প্রযুক্তি উন্নয়ন, ওপেন সোর্স মডেল, দ্রুত ব্যবহারযোগ্য উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের কৌশল বেছে নিয়েছে। কম খরচের সাফল্যের পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। চীনের একজন এআই প্রকৌশলীর গড় বার্ষিক বেতন প্রায় ৫৭ হাজার ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে সরকার ডেটা সেন্টারগুলোকে সস্তা বিদ্যুৎ, জমি ও বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে। এ ছাড়া দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি এআই-সংশ্লিষ্ট পিএইচডি গবেষক তৈরি করছে। চীনের আরেকটি বড় শক্তি হলো ওপেন সোর্স কৌশল। ডিপসিক, কিউওয়েন এবং মিনিম্যাক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মডেল উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডেভেলপার, গবেষক ও স্টার্টআপ সহজেই তা ব্যবহার করতে পারছে। প্রয়োজনে পরিবর্তন ও উন্নত করতে পারছেন। দেশটির শত শত গবেষণা দল ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন তাদের মডেলের আর্কিটেকচার, ওয়েটস এবং প্রশিক্ষণ-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রকাশ করছে। ফলে একটি যৌথ প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের যে কেউ নতুন প্রযুক্তি তৈরি ও উন্নয়ন করতে পারছেন। এতে এআই উদ্ভাবনের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রযুক্তির ব্যবহার আরও গণমুখী হয়েছে। টেক্সট-টু-ইমেজ ও ভিডিও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ক্লোয়ি ফ্যাংয়ের মতে, চীনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত বাস্তববাদী। তারা এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চায়, যা সরাসরি ব্যবহারকারীদের জন্য মূল্য তৈরি করবে। এ কারণে ওপেন সোর্সকে তারা বৈশ্বিক ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রথমে উন্মুক্ত প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের আস্থা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করা হয়, এরপর আরও উন্নত বাণিজ্যিক মডেল বাজারে আনা হয়। ইতোমধ্যে জেনারেটিভ মিডিয়া খাতে চীনের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ইমেজ-টু-ভিডিও মডেলের মধ্যে পাঁচটি এবং শীর্ষ ১০টি টেক্সট-টু-ভিডিও ও ইমেজ এডিটিং মডেলের মধ্যে তিনটিই চীনা প্রতিষ্ঠানের। চীনের এই কৌশল দেশটির দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও অংশ। এটি একটি উন্মুক্ত প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি অর্থনীতি, শিল্প ও সামাজিক খাতের সঙ্গে এআইকে গভীরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলাফলও দৃশ্যমান। কিউওয়েন, মিনিম্যাক্স ও ডিপসিকের মতো চীনা ওপেন সোর্স লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এখন বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করে নিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে এই উপস্থিতি ছিল প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। চীন ছাড়াও সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অসংখ্য স্টার্টআপ ও প্রতিষ্ঠানও চীনা এআই মডেল ব্যবহার করছে। কারণ এসব প্রযুক্তি সহজলভ্য, তুলনামূলক স্বচ্ছ এবং অনেক মার্কিন বিকল্পের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ও অনেক কম। সিনোভেশন ভেঞ্চারসের প্রতিষ্ঠাতা এবং গুগল চায়নার সাবেক প্রধান কাই-ফু লি বলেছেন, এই প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো এর নমনীয়তা। ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী উপাদান বাদ দিতে বা নতুন কিছু যুক্ত করতে পারেন। তার মতে, অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও গবেষক চীনা মডেল ব্যবহার করছেন চীনা হওয়ার কারণে নয়, বরং সেগুলো উন্মুক্ত হওয়ার কারণে। আলিবাবা ক্লাউডের প্রতিষ্ঠাতা জিয়ান ওয়াং মনে করেন, বর্তমান এআই যুগ অনেকটা ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ইন্টারনেটের বিস্তারের সময়কার পরিস্থিতির মতো। সেই সময়ে নেটস্কেপ তাদের ব্রাউজারের কোড উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। যা বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তার মতে, এখন শুধু সোর্স কোড নয়, বরং মডেল ওয়েটস, ডেটা এবং কম্পিউটিং সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদও সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে ডেভেলপাররা নিজেদের কাজ বারবার পুনরায় তৈরি করার প্রয়োজন থেকে মুক্ত হতে পারবেন এবং নতুন উদ্ভাবনে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু ওপেন সোর্স হলেই চলবে না। একটি মডেলকে অবশ্যই কার্যকর, নির্ভরযোগ্য এবং অন্যদের তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আন্দ্রেসেন হোরোভিটজের গবেষকদের মতে, এআই শিল্প এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে যে কোনো মডেল যদি ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা খুব দ্রুত অন্য বিকল্পের দিকে চলে যাবেন। এছাড়াও, ইলন মাস্ক, পামার লাকি এবং স্কেল এআইয়ের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার ওয়াংসহ কয়েকজন মার্কিন প্রযুক্তি নেতা ডিপসিকের কম বাজেটের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের ধারণা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ডিপসিক হয়তো এনভিডিয়ার আরও উন্নত ‘H100’ চিপ এবং গোপন অর্থায়নের বিষয়টি প্রকাশ করেনি। তবে এই বিতর্ক যাই থাকুক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তা হলো, ভবিষ্যতের এআই প্রতিযোগিতা আর শুধু কে সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল তৈরি করতে পারে, সেটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন