০৬:১৩ পি.এম
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্রসৈকত ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিত। একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাগরের ঢেউয়ের আকর্ষণে দূরদূরান্তের পর্যটকরা এখানে ভিড় করতেন। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে সৈকতটি ছিল উপচেপড়া ভিড়ে ভরা। তবে বর্তমানে যোগাযোগব্যবস্থার অবনতি, দীর্ঘ যানজট, সড়কবাতির অভাব এবং নিরাপত্তার সংকটের কারণে এই সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র দিন দিন পর্যটক হারাচ্ছে। শারদীয় দুর্গাপূজা ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় বাড়তি জনসমাগমের সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পারকি সৈকত, যা স্থানীয়দের কাছে ‘পারকির চর’ নামেও পরিচিত, কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতের সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এর পর্যটন সম্ভাবনাকে ব্যাহত করছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারকি সৈকতে যাতায়াতের প্রধান বাধা সংকীর্ণ সড়ক ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। সৈকতে প্রবেশের সেতুটি প্রশস্ত না হওয়ায় এক পাশ দিয়ে গাড়ি চলাচলের সময় বিপরীত পাশের যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। সড়ক সরু হওয়ায় বিশেষ করে ছুটির দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে, যা পর্যটকদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আরও পড়ুন: কাউখালীতে ২৫ কেজি লবণ মাখা ইলিশ জব্দ, এতিমখানায় দান
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন যে যানজট ও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগের কারণে অনেক পর্যটক এখন পারকি সৈকতে আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন। কিছু পর্যটক বিকল্প হিসেবে ফুলতলী সমুদ্রসৈকতের দিকে ঝুঁকছেন।
সন্ধ্যা নামলেই বাড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ:
সৈকতে সড়কবাতি ও বিদ্যুৎ-সংযোগের অভাবে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। ফলে পর্যটকদের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রায় দেড় মাস ধরে সৈকতে পর্যটন পুলিশের উপস্থিতি নেই। ফলে চুরি ও পর্যটকদের হয়রানির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সৈকত এলাকায় গড়ে ওঠা প্রায় ১১০টি দোকানের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে অনেক দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। বর্তমানে ৫২টি দোকানের মধ্যে মাত্র চার-পাঁচটিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ রয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মাগুরার শ্রীপুরে মদপানে অসুস্থ দুই যুবকের হাসপাতালে মৃত্যু
পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর দাবি:
চট্টগ্রাম শহর থেকে আসা সোলাইমান এবং হাটহাজারী থেকে পরিবার নিয়ে আসা রহমতুল্লাহ জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ পারকি সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে পর্যটনশিল্প বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, সেতুর সক্ষমতা বৃদ্ধি, যানজট নিরসন, নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে পারকি সৈকত আবারও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
পারকি সৈকত ব্যবসায়ী সমিতির দাবি:
আরও পড়ুন: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখায় জিয়াউদ্দিন হায়দারকে প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সংবর্ধনা
পারকি সমুদ্রসৈকত ব্যবসায়ী সমিতির মো. কাশেম বলেন, পারকি সৈকতের পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে প্রধান সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তার ঘাটতি। সৈকতে সড়কবাতি নেই। চলাচলের জন্য কয়েকটি সড়ক থাকলেও কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি সড়কের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, টাকা দিয়ে পার্কিংয়ের টিকিট কেটে আসলেও নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। এতে গাড়ি সৈকত ও সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে রাখতে হয়, যা যানজট সৃষ্টি করে। এসব সমস্যার কারণে পর্যটকেরা পারকি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
কাশেম আরও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। তা না হলে পারকির পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে যানজট কমাতে তিনি সৈকতে প্রবেশের পাঁচটি সড়কের মধ্যে ৩ ও ৫ নম্বর সড়ক ব্যবহার করে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। পরিকল্পিতভাবে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করা গেলে বিসর্জনে আসা মানুষের যাতায়াত সহজ হবে।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে মহাসড়কে পুলিশের রেকারের পেছনে প্রাইভেটকারের ধাক্কা, চালক নিহত
দুর্গাপূজায় নিরাপত্তায় পুলিশের প্রস্তুতি:
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ও প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে পুলিশ।
কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, বন্দর এলাকায় তিনটি স্থানে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হবে। পূজা উদ্যাপন কমিটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকবে। প্রয়োজন হলে পারকি সমুদ্রসৈকতে পুলিশের দল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা বিসর্জনের স্থান পর্যন্তও নিরাপত্তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, পারকি সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের নিজস্ব খরচে সেখানে যেতে হয়। আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পার্কিংয়ের জন্য টাকা নেওয়া হয়। তবে নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা না থাকায় কিছু মোটরসাইকেলচালক ভাড়ার টাকা নেওয়ার মাধ্যমে পর্যটকদের হয়রানি করেন। এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। একটি চক্র ছিনতাই করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি আনোয়ারা উপজেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় জানাচ্ছেন বলে জানান।
আরও পড়ুন: লিবিয়ায় জিম্মি করে ২৫ লাখ টাকা আদায়, দেশে ফিরেও হামলার শিকার প্রবাসী
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, আনোয়ারা থানার আওতায় ৩০১টি স্থানে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১২টি স্থায়ী মন্দির এবং ১৮৮টি ঘটপূজার স্থান। পূজার নিরাপত্তায় ছয়টি টহল দল মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক পূজামণ্ডপ থাকা এলাকায় অতিরিক্ত টহল এবং সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের নির্দেশনা অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদ্যাপন নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে বলেও জানান তিনি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন