০৫:৩৫ এম
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, বিগত ১৭ বছরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে। তিনি এ বিষয়ে বলেছেন যে, মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ঐক্য নষ্ট হলে চলবে না। যেভাবে তারা বিগত সময়ে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, সেভাবে আগামীতেও ঐক্য ধরে রাখতে হবে। বিগত নির্বাচনে দলকে যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে জিতিয়ে আনা হয়েছে, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেরকমই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলকে জিতিয়ে আনতে হবে। ঐক্য থাকলে ফ্যাসিস্ট বা গুপ্ত কেউ ঢুকতে পারবে না বা সুবিধা নিতে পারবে না। কিন্তু যদি ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি হয়, তাহলে তাদের সুযোগ তৈরী হবে।
সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় তিনি এইসব কথা বলেন।
বিগত ১৭ বছরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নেতাকর্মীদের তিনি বলেন, ‘আপনারা গত ১৭ বছরে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। গুম, খুন, নির্যাতনের শিকার হয়ে আপনাদের সবাইকে দলের জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই সময় আপনারা নিজের পরিবারের চেয়ে বেশি সময় এবং উৎসর্গ করেছেন। টেনশন ও যন্ত্রণা সকলেই পেয়েছেন, কিন্তু নিজের জন্য কি তা করেছেন? না। এভাবে দেশে সব বিএনপি নেতাকর্মী ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এখন সেই নির্যাতনের ভয় নেই। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন মাভাবিপ্রবি উপাচার্য
এ সময় তিনি হাইব্রিড ও গুপ্তদের বিষয়ে সতর্ক করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন যে, নির্বাচনের আগে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং তারা এখনও সক্রিয়। আরেকটি গ্রুপ দেশের বাইরেও ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। তাই দলকে সুসংগঠিত করতে হবে। হাইব্রিড ও গুপ্তদের বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে যাতে তারা দলের নেতৃত্বে ঢুকতে না পারে।
নেতাকর্মীদের ত্যাগের জন্য বিএনপি সরকার গঠন করতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘আপনাদের কি চান? আপনাদের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক? তাহলে তৃণমূলে ঐক্য থাকতে হবে। তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে হবে। আপনারাই বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছেন।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলীয় প্রধান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য অনেক প্রস্তুতির প্রয়োজন। কিন্তু সেটি কি আপনাদের আছে? নেই। প্রস্তুতি ছাড়া জিততে পারবেন? না। তাই সরকার চলতে পারবে? স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবশ্যই হবে। বর্ষার পর আলোচনা করে ঠিক করা হবে। এর আগে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন কে চেয়ারম্যান, কে সদস্য হবেন এবং কে দল চালাবেন। আমরা দল নিয়ে সামনে চলতে চাই।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী কয়েকদিন পর হিন্দুদের এই বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান। যারা এখানে আছেন তাদের বলছি, আর যারা আসেননি, আপনারা তাদেরও বলবেন— তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেকোন মূল্যে শান্তিপূর্ণভাবে সফল করতে হবে। যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে। কেউ যেন সেই সুযোগ না পায়।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
বক্তব্যের শুরুতে বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি, অনিয়ম ও উন্নয়নের নামে লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছরে এত উন্নয়ন, উন্নয়ন বলতে শুনতাম। কিন্তু আসলে উন্নয়ন কোথায় হয়েছে? হয়েছে, তবে সেটি যারা ক্ষমতায় তারা নিজেদের পকেটে। সেসব উন্নয়ন কোনো কাজে আসছে না। সব ক্ষেত্রেই তারা ধ্বংস করে দিয়েছে।’
উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে ৫৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, অথচ পদ্মা সেতুর সমমানের ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর প্রকল্পেও অস্বাভাবিকভাবে খরচ বেড়ে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের প্রকাশিত শ্বেতপত্রে দেখা গেছে, গত ১৭ বছরে প্রতি বছর ১৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।’
‘উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তা-ঘাট করা?’ এমন প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন জেলায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে কেন? ঢাকা শহরে বড় বড় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু ড্রেন ও খাল ভরাট হয়ে গেছে। তাই সব জায়গায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। উন্নয়ন হবে, আমরা করব। কিন্তু উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তা-ঘাট? আমরা উপজেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ হাতে নিয়েছি। উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রেখেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে খালেদা জিয়ার সরকার সেগুলো ৫১ শয্যায় উন্নীত করেছিলেন। আমরা এগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করব। বিশেষ করে অসুস্থ হলে শিশুদের খুব কষ্ট হয়, তাই সারা দেশে এক হাজারটি শিশু হাসপাতাল তৈরি করব। উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তা-ঘাট নয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু চিকিৎসা, খাল খনন—সবই উন্নয়ন।’
দেশের চরম সংকটকালীন সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর আরও কয়েকটি জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এসব প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কী অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, সে সম্পর্কে আপনাদের খুব ভালো ধারণা আছে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল করা হয়েছে, চিকিৎসা খাতও নাজুক। মহানগর ও জেলায় যারা আছেন, তারা কিছুটা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। তবে উপজেলা পর্যায়ের অবস্থা খুবই খারাপ। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে আমাদের সনদের বিদেশে কোনো মূল্য নেই। শিক্ষিতরাই সবচেয়ে বেশি বেকার। অল্প শিক্ষিতরা তবুও কিছু কাজ করতে যাচ্ছে। এসব কাজ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এগুলো না হওয়ার কারণ হল জবাবদিহির অভাব। জবাবদিহি বলতে নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচন হবে, মানুষ ভোট দিয়ে তাদের শাসক নির্বাচন করবে। গত ১৭ বছরে সেই জবাবদিহির ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে।’
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
তিনি বলেন, ‘এমন ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। আমরা বলেছিলাম ফ্যামিলি কার্ড দেব, দিয়েছি। কৃষক কার্ড দেব, সেটিও শুরু করেছি। যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেসব বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছি। পরিকল্পনা ছিল বলেই কাজ শুরু করতে পেরেছি। আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছি ফেব্রুয়ারিতে। তার একদিন পরই রমজান শুরু হয়। সেই রমজানে আমরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে দিইনি। মানুষ তুলনামূলক স্বস্তিতে রমজান কাটিয়েছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলো। তখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেল, সরবরাহ কমে গিয়েছে। ফলে আমাদের অতিরিক্ত আড়াই বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।’
উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক পরিবারে পাঁচজন বিভিন্ন কাজ করলে একজনের দায়িত্ব যদি ঘর গুছিয়ে রাখা হয়, কিন্তু সবাই মিলে ঘর নোংরা করে, তাহলে সেই একজন সবার ময়লা পরিষ্কার করতে সক্ষম হবেন না। সবাই মিলেই পরিষ্কার রাখলে ময়লাও কম হবে। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, পরিবার যেমন, দেশও তেমন। আপনারা বর্তমানে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। তাই আপনাদের বুঝেশুনে কাজ করতে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন