শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৭:১৭ পি.এম
বিশ্বের সামরিক শক্তি ও আধিপত্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে নতুন করে একটি বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এ ধরনের সংঘাত ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত ফলাফল না এনে বরং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয় দফায় বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর ফলে দেশটির অভ্যন্তরে পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান আরো শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাহদি নিকসেফাত মোতলাঘ ও কিয়াভাশ কালহোরের বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন একটি যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে সেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে অপরিহার্য মনে করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার বিষয়টিকে আরো বড় সামরিক অভিযানের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের ব্যয় যত বাড়ে, কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জনের পথ তত কঠিন হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতেও এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য নিয়ে ওয়াশিংটন সংঘাতে জড়িয়েছে, সেটি এখন মার্কিন ক্ষমতা ও প্রভাবের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত আটলান্টিকের প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের এমন একটি ধারণার কথা উঠে এসেছে যে, অর্থনৈতিক চাপের মুখে ইরান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন করে হামলা চালানো হলে দেশটির সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে। তবে ইরানে আবার হামলা চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং নতুন করে চাপ প্রয়োগ করলে এবার চূড়ান্ত ফল পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা আবারও সামনে এসেছে।
লেখকদের মতে, এই ধারণার মধ্যে পুরোনো একটি ভুল হিসাব রয়েছে। সেটি হলো, কোনো প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে ফেলতে পারলেই তার আচরণ নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু সামরিক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও কোনো দেশ প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক শর্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য শত্রু’ ধারণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কোনো প্রভাবশালী শক্তির জন্য একটি পরিচিত প্রতিপক্ষ অনেক সময় সামরিক জোট সংগঠিত করা, বিদেশে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং নিরাপত্তার নামে মিত্রদের পাশে রাখার যুক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে এ ক্ষেত্রে শত্রুর হুমকি, তার সঙ্গে সংঘাতের ব্যয় এবং সংঘাতের সমাপ্তি—সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রত্যাশা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতিতেও ইরানকে এমন একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, ইরান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে দেশটির সঙ্গে সংঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার একই সঙ্গে দেশটিকে এতটাই দুর্বল মনে করা হয় যে, তারা সংঘাতের নিয়ম বা গতিপথ পরিবর্তন করতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে জার্মান আইনবিদ ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল স্মিটের সুরক্ষা ও আনুগত্যবিষয়ক তত্ত্বের উল্লেখযোগ্য। কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন অন্যদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব নেয়, তখন সেই নিরাপত্তার হুমকি নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরিতেও তার ভূমিকা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কিন্তু কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে যদি মিত্রদের নিরাপত্তাই আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে সেই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সামরিকভাবে কোনো দেশকে ধ্বংস করার সক্ষমতা থাকা আর সংঘাতের পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও পাল্টা হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অক্ষুণ্ন থাকলেও সংকট নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল বলে মনে করেন লেখকেরা। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাত করতে সক্ষম হলেও দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূল একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়নি। ইরানের ক্ষেত্রেও সামরিক হামলার মাধ্যমে সরকারকে দুর্বল করা এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটানোর মধ্যে বড় ধরনের বাধা রয়েছে।
ইরানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন ভিত্তি এবং দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা দেশটিকে টিকে থাকার সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা সামরিক কমান্ডারকে সরিয়ে দিলেই পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যাবে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। কোনো সরকার দুর্বল হয়ে পড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই বাস্তবতাকে ভিন্ন মাত্রায় সামনে এনেছে। এসব হামলায় ইরানের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যে রাজনৈতিক ফল চেয়েছিল, অর্থাৎ ইরানকে তাদের নির্ধারিত ভবিষ্যৎ মেনে নিতে বাধ্য করা, তা এখনো অর্জিত হয়নি।
ট্রাম্প প্রথমদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় মাস পরও যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছে, যেখানে একদিকে চাপ বাড়ানোর চিন্তা চলছে, অন্যদিকে সম্মানজনকভাবে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথও খোঁজা হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে সংঘাতের সমাপ্তি কীভাবে হবে, সেই হিসাবও বদলে যায়। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করার সঙ্গে যুক্ত করেন, তাহলে ইরানের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার স্বীকার করে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো তার কাছে পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয়টি তখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মিত্রদের আস্থার সঙ্গেও জড়িয়ে যায়।
তৃতীয় দফা হামলার ঝুঁকি কেন বাড়ছে
যুদ্ধের সমাপ্তি মানেই যে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অবসান ঘটবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং বিপদ তৈরি হচ্ছে যুদ্ধের সমাপ্তিকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, তা নিয়ে। ওয়াশিংটন যদি মনে করে, ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনো ফলাফল গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য পথগুলো নিজেরাই সংকুচিত করবে।
এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় দফায় বড় ধরনের হামলাকে আগের দুই দফা অভিযানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে।
প্রতিবারই এমন হামলার পক্ষে একই ধরনের যুক্তি দেওয়া হয়—এবারের চাপই হবে চূড়ান্ত। কিন্তু প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল না এলে আগের হামলাগুলোকে সঠিক প্রমাণ করতে আরও চাপ প্রয়োগের দাবি ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে। কারণ কোনো নেতা যদি সংঘাত থেকে সরে আসাকে পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে সেই পরাজয় এড়াতে তিনি উল্টো যুদ্ধে আরো বেশি জড়িয়ে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে ইরানও সংঘাতের শুরুতে যেমন অবস্থায় ছিল, এখন আর তেমন নেই। হামলার অভিজ্ঞতা দেশটির হুমকি মোকাবিলার কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে। সামরিক কমান্ডারদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব তৈরি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রতিপক্ষের ওপর বিভিন্ন উপায়ে ক্ষতির চাপ তৈরি করার সক্ষমতা ইরানকে অভিযোজনের সুযোগ দিয়েছে।
তবে যুদ্ধের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে ইরান সব ধরনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত। সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো টিকে থাকলেও দেশটির জনগণ অর্থনৈতিক চাপ, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং সম্পদের সংকটে ভুগতে পারে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের সামরিক কৌশল পরিবর্তন করতে পারে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের যেকোনো হামলা ব্যর্থ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে বাড়ছে যুক্তি
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, যুদ্ধ সহ্য করার সক্ষমতা থাকলেও তা ভবিষ্যতে নতুন করে হামলা শুরু হওয়া ঠেকাতে পারছে না। ইরান হয়তো প্রতিপক্ষকে সহজে বিজয়ী হতে দেবে না, কিন্তু বারবার হামলা, পুনর্গঠন এবং নতুন করে সামরিক হুমকির চক্রের মধ্যে আটকে থাকার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
যদি যুদ্ধবিরতির পরও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং নতুন করে হামলার আশঙ্কা থেকে যায়, তাহলে ইরানের পুনর্গঠন কার্যক্রমও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। রাষ্ট্র ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করলেও প্রতিপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের নীতিনির্ধারকেরা যদি মনে করেন, প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা দিয়ে যুদ্ধের ব্যয় বাড়ানো গেলেও নতুন হামলা ঠেকানো যাচ্ছে না, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি আরো শক্তিশালী হতে পারে।
এ ধরনের বিতর্কের লক্ষণ ইতিমধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে দেখা যাচ্ছে। ২০ অক্টোবর কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসে প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের কয়েকজন কট্টরপন্থি রাজনীতিক, আইনপ্রণেতা ও বিশ্লেষক পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিরোধিতা থেকে সরে আসা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দাবি তুলছেন।
তবে ইরান সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অংশে পারমাণবিক নীতির পরিবর্তনের পক্ষে আলোচনা বাড়ছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় দফার সামরিক হামলাও যদি ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে থাকা গোষ্ঠীগুলো আরো শক্তিশালী যুক্তি পাবে। তাদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে বোমা হামলা বন্ধ হওয়া ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। তাই নতুন করে হামলা ঠেকানোর উপায় হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রস্তাব সামনে আসতে পারে।
তবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের রাজনৈতিক আগ্রহ, এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি—এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ৭ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। ফলে ইরান চাইলেই সহজে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে, এমন ধারণার ভিত্তি নেই। বরং এ পথে এগোনোর চেষ্টা নতুন করে সামরিক হামলার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
ইসরাইলের হিসাব ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্বার্থ
এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সরকার ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আবার বাড়তে শুরু করলে নতুন করে হামলার দাবি উঠতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ইসরাইলের নিরাপত্তার হিসাব বিবেচনা করলেই চলবে না। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্রদের নিরাপত্তা, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় এবং সংঘাতের অবসান ঘটানোর সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। ইরানের প্রতিটি পুনর্গঠন প্রচেষ্টাকে নতুন মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের কারণ হিসেবে দেখলে সংঘাতের চক্র আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সংঘাত এড়াতে প্রয়োজন স্থায়ী সমঝোতা
নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে হলে উভয় পক্ষের হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আনা জরুরি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর যাচাইযোগ্য সীমাবদ্ধতা আরোপের পাশাপাশি দেশটির ওপর নতুন করে হামলার ঝুঁকি কমানোর বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বাস্তব সুযোগও তৈরি করতে হবে।
শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতির আশ্বাস দিয়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চিন্তা থেকে সরিয়ে রাখা কঠিন হবে। বরং দেশটির জন্য একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করা গেলে পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থার পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি দুর্বল হতে পারে।
নিজেদের বৈশ্বিক ক্ষমতা ও আধিপত্য ধরে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ব্যর্থ যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং বিশ্বজুড়ে নিজেদের অবস্থান হারানোর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। ইরানের আত্মসমর্পণকেই যদি মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের ক্ষমতাকে ক্রমবর্ধমান ব্যয়বহুল সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলবে।
তৃতীয় দফায় যুদ্ধ শুরু হলে ওয়াশিংটন হয়তো আবারও প্রমাণ করতে চাইবে যে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু তেহরান যদি বারবার হামলার অভিজ্ঞতা থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে ভবিষ্যতে নিজেদের ওপর হামলার ব্যয় স্থায়ীভাবে বাড়াতে হবে, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের তাগিদ আরও জোরালো হতে পারে।
অর্থাৎ, নিজেদের বৈশ্বিক আধিপত্য রক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক ঝুঁকি নিতে পারে, তা শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে পারে। যে পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোর যুক্তিতে এত সামরিক অভিযান, সেই অভিযানই উল্টো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের পথে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ইসরাইলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোশে ইয়ালন দেশটির বিরোধী ব্লগের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইসরাইলের পরবর্তী সরকার গঠনে আরব দলের নেতা মনসুর আব্বাসকে একজন মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
দ্য টাইমস অব ইসরাইলের একটি লাইভব্লগ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বিরোধী দলগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে ইয়ালন বলেন, রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যতের সরকার পরিচালনার স্বার্থে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রাম (Ra'am) পার্টির প্রধান মনসুর আব্বাসকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করা অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর ভূমিকা দিন দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং ইয়ালনের এই মন্তব্য ইসরাইলি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ৮ নম্বর বিশকাকুনি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী আলহাজ্ব হাফেজ মোঃ আবু হানিফ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী নবীন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত আবু হানিফ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নানা কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তাঁকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে বলে দাবি তাঁর।
স্থানীয় মানুষের ভাষ্য ও তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরে অসহায় মানুষের মধ্যে পোশাক বিতরণ এবং ঈদুল আজহায় আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছেন তিনি। এ ছাড়া এলাকার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন।
আবু হানিফের উদ্যোগে নিজ গ্রামে ১৪ শতাংশ জমি কিনে তিনতলা ভবন নির্মাণের উপযোগী ভিত্তির ওপর একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ইউনিয়নের ৮০টির বেশি মসজিদ ও ২০টির বেশি মাদ্রাসায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি দুটি গ্রামের ঈদগাহ মাঠে নামাজের কাতারের জায়গা পাকা করার কাজে সহযোগিতা করেছেন।
বর্ষা মৌসুমে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া বিভিন্ন সড়কে বালু ও পাথরের খোয়া ফেলে চলাচলের উপযোগী করার উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি। সারিচাতলা বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে নিজ অর্থায়নে দুটি গোলপোস্ট স্থাপন করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং শীতকালীন ইসলামি মাহফিলেও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকেন।
করোনাকালীন সংকটে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেন আবু হানিফ। তাঁর দাবি, ইউনিয়নের অনেক পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর চিকিৎসার জন্যও তিনি সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত অর্থায়নে একটি অ্যাম্বুলেন্স কিনে এলাকার মানুষের বিনা মূল্যে ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থা করেছেন বলে জানান তিনি।
২০২৪ সালে সরকার পতনের পর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার, পানি ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করেছিলেন বলেও জানান আবু হানিফ। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে প্রজেক্টর ও ৩২ ইঞ্চি টেলিভিশনের ব্যবস্থা করে ফুটবল বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন খেলা একসঙ্গে দেখার সুযোগ তৈরিতে উদ্যোগী হন তিনি।
আবু হানিফ বলেন, মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ অব্যাহত রাখতে চান। তাঁর কাছে কেউ সাহায্য-সহযোগিতার জন্য এলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করার চেষ্টা করবেন বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পেলে ইউনিয়নের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আরও বেশি কাজ করতে চান আবু হানিফ। তাঁর ভাষ্য, এলাকার মানুষের পাশে থেকে বিশকাকুনি ইউনিয়নকে একটি উন্নত ও বাসযোগ্য জনপদ হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আজকার এবং দ্বীনি আলোচনার মধ্য দিয়ে নীলফামারী সদর উপজেলার ঐতিহাসিক দারোয়ানী টেক্সটাইল মিল মাঠে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে তিন দিনব্যাপী জেলা ইজতেমা। দ্বীনের দাওয়াত ও ইসলামের সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই মহাসমাবেশে অংশ নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি।
একই ছাদের নিচে ঈমানী আবহ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও যুক্ত হয়েছেন ধর্মপ্রাণ মেহমানরা। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, সুদান ও সৌদি আরবসহ বিশ্বের ৬টি দেশের ১২ জন বিদেশি নাগরিক এই আঞ্চলিক ইজতেমায় উপস্থিত থেকে দ্বীনের কাজ পরিচালনা করছেন।
দিনভর ইবাদত ও দ্বীনি বয়ান:
ইজতেমার মূল কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন ফজর থেকে এশা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলছে মূল মঞ্চের আলোচনা। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা ওলামায়ে কেরামগণ পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানবকল্যাণ, আত্মশুদ্ধি, দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং বিশ্বময় দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর বিস্তারিত বয়ান পেশ করছেন।
আজ শুক্রবার জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে ইজতেমা ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মূল প্যান্ডেল ছাড়িয়ে মহাসড়ক ও আশেপাশের খোলা মাঠেও পলিথিন ও চাটাই বিছিয়ে নামাজে শরিক হন লাখো মুসল্লি। জুমার খুতবায় ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহ গড়া ও বিশ্বশান্তির বাণী পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
শনিবার ১১টায় আখেরি মোনাজাত:
জেলা তাবলিগ জামায়াতের পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল ৩১ অক্টোবর (শনিবার) বেলা ১১টায় আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে তিন দিনব্যাপী এই ইজতেমার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। মোনাজাতে দেশ, জাতি ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনার পাশাপাশি বিশ্ব শান্তির জন্য খাস দোয়া করা হবে। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে শনিবার ভোর থেকেই আশেপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটবে বলে ধারণা করছেন আয়োজকরা।
নিচ্ছিন্দ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা:
ইজতেমা ঘিরে পুরো দারোয়ানী টেক্সটাইল মিল এলাকা ও আশপাশের আঞ্চলিক মহাসড়কে জোরদার করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাবলয়। নীলফামারীর পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ হোসেন খান জানিয়েছেন, মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে যাতায়াত এবং অবস্থান নিশ্চিত করতে পুরো এলাকাকে দুটি বিশেষ সেক্টরে ভাগ করে ১৮৪ জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রাখা হয়েছে।
এছাড়া পোশাকধারী পুলিশের সাথে সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সাদা পোশাকের নজরদারি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্পেশাল টিম। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি বা স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে মেডিক্যাল টিম ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ দল।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ