০২:৫৩ পি.এম
বাংলাদেশে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)।
সংস্থাটি জানিয়েছে যে, অবকাঠামো, উৎপাদনশীল খাত, বাণিজ্য নীতি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
বাসস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডব্লিউটিও’র উপ-মহাপরিচালক শিয়াংচেন ঝাং বলেন, বাণিজ্য সহায়তা উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য সুবিধাভোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও তার উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও অর্থনীতির সহনশীলতা জোরদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতারই এটি প্রতিফলন।
আরও পড়ুন: দেশে ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ক্রেডিটর রিপোর্টিং সিস্টেমের তথ্য অনুসারে, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ‘এইড ফর ট্রেড’ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৬০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য সময়ে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই সর্বোচ্চ সহায়তা পাওয়া দেশ।
ঝাং বলেন, এই সহায়তার প্রায় ৬৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে। বিশেষ করে জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে। কৃষি, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাসহ উৎপাদনশীল খাতে প্রায় ৩০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি প্রায় দুই শতাংশ ব্যয় হয়েছে বাণিজ্যনীতি ও নিয়ন্ত্রকমূলক কার্যক্রমে।
তিনি বলেন, ‘অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে গুরুত্ব দেওয়া বৈশ্বিক বাণিজ্য সহায়তা প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব উদ্যোগ সরবরাহ-পক্ষের সীমাবদ্ধতা দূর করে বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।’
ডব্লিউটিওর এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ভবিষ্যতেও অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে সহায়তা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যনীতি, ডিজিটালাইজেশন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী
তার মতে, বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা বেড়ে গেলে বাংলাদেশ সহজেই বৈশ্বিক বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হবে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল পরিবেশে কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারবে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডব্লিউটিওর সহযোগিতা তুলে ধরে ঝাং বলেন, সংস্থাটি বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত কারিগরি সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশে ডব্লিউটিওর সমর্থনে দুটি কার্যক্রম আয়োজন করা হয়েছে।
ডব্লিউটোতে বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদন দাখিলসংক্রান্ত একটি কর্মসূচির পর বাংলাদেশের সরকার বাণিজ্য আলোচনা দক্ষতা বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলে নির্বাচন: ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, চূড়ান্ত ফলাফল দুই দিনে আসবে
ঝাং বলেন, ‘আশা করছি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই কার্যক্রম আয়োজন করতে পারব।’
তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণের সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
ডব্লিউটিওর উপ-মহাপরিচালক জানান, ই-লার্নিং কোর্স, উন্নত বাণিজ্যনীতি কর্মসূচি, আঞ্চলিক কর্মশালা এবং বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণসহ ডব্লিউটিওর কারিগরি সহায়তা কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত ২৮১ জন বাংলাদেশি কর্মকর্তা অংশ নিয়েছেন।
এছাড়া, ডব্লিউটিওর দীর্ঘমেয়াদি প্লেসমেন্ট কর্মসূচি ও ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাত তরুণ পেশাজীবী উপকৃত হয়েছেন। এটি ভবিষ্যতের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করছে।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: সরকার গঠনের তিন সম্ভাব্য পথ
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক চাপের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে ঝাং বলেন, নতুন নতুন বাণিজ্য সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং সেগুলোর সমন্বিত সমাধান খুঁজে বের করার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ওয়টিও কাজ করছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর চালু হওয়া ডব্লিউটিওর ‘ট্রেড মনিটরিং রিপোর্ট’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলা বিভিন্ন পদক্ষেপের স্বচ্ছতা ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় সদস্য দেশগুলোর সাড়া দেওয়ার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন ঝাং।
তিনি বলেন, ব্যাপক বিপর্যয়ের মধ্যেও আন্তর্জাতিক কারণে জরুরি পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয়েছিল।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে হারের মুখে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ লিকুদ পার্টির
তিনি জানান, ২০২২ সালে মানবিক সহায়তার জন্য বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) কেনা খাদ্যপণ্যের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার সিদ্ধান্ত নেয় ডব্লিউটিওর সদস্যরা। এটিকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবেও বর্ণনা করেন।
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বলেও মন্তব্য করেন ঝাং। তিনি আরও বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছে।
ডব্লিউটিওতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নেতা ও নীতি বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক আলোচনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। সেখানে ফুটওয়্যার, ওষুধশিল্প, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক, হোম টেক্সটাইল, ক্ষুদ্র উৎপাদন খাত ও ডিজিটাল সেবার নতুন সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
ঝাংয়ের মতে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, নকশা দক্ষতা, মেধাস্বত্ব উন্নয়ন এবং বিপণন কৌশলে আরও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: শামা ওবায়েদের স্পেন ও ইইউর সহযোগিতার প্রশংসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায়
প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও মূল্য শৃঙ্খলের কিছু অংশে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ উচ্চ মজুরির কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তোলার সক্ষমতার প্রমাণ দেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আরও বহুমুখী উৎপাদন ও রপ্তানি কাঠামো গড়ে তুলছে। এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’
ডব্লিউটিও’র এই উপ-মহাপরিচালক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়েও আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং নীতিগত সক্ষমতায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন