০৫:৩৬ পি.এম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি জাপানের বাজারে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রসঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ), জাপানি ক্রেতাদের আগ্রহ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, ক্রেতাদের আস্থা অর্জন, ভিসা জটিলতা দূর করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর উপদেষ্টা কাজী সারওয়ার হাবিব।
জাপানে চার দশক ধরে বসবাসকারী এই ব্যবসায়ী নেতা উল্লেখ করেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অবস্থান শক্তিশালী হলেও জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে, এ বাজারে রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে জাপানের রাজধানী টোকিওর হোটেল নিউ ওতানিতে সময়ের আলোর বিশেষ প্রতিনিধি ও ডেপুটি চিফ রিপোর্টার রফিক রাফির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: সৌদি আরব থেকে ৯ মাসে ২ হাজার মরদেহ, নারী কর্মীরা সন্তানের বাবার পরিচয় জানেন না
সাক্ষাৎকারে কাজী সারওয়ার হাবিব জাপানের বাজারে পোশাক রপ্তানি, দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক, সম্ভাব্য বিনিয়োগ, ভিসা জটিলতা, দক্ষ জনশক্তি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ জাপানে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। কাজী সারওয়ার হাবিবের মতে, যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এ রপ্তানি ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মান, নকশা ও সরবরাহের সময়সীমা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সক্ষমতা তুলে ধরতে পারলে নতুন ক্রেতা আকর্ষণ করা সহজ হবে।
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান শক্তিশালী করতে বিজিএমইএও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। কাজী সারওয়ার হাবিব জানান, এ বছর সংগঠনটিতে ‘জাপান ডেস্ক’ চালু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিজিএমইএর ৫২ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো জাপানি রাষ্ট্রদূত সংগঠনটির কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন।
আরও পড়ুন: দুধের উৎপাদন খরচ ৪৪.৮০ টাকা, বিক্রি ১০০-১১০ টাকায়
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিও রপ্তানি বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। চুক্তির আওতায় তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ পাবে। তবে, এ সুবিধা কার্যকর হওয়ার সময়সূচি ও পণ্যভিত্তিক শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
কাজী সারওয়ার হাবিব বলেন, ইপিএর সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে পণ্য উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগী হলে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন কাজী সারওয়ার হাবিব। তার মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়লে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার টোকিওতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও গভর্নর মেস্তাকুর রহমানের সঙ্গে জাপানের ব্যবসায়িক নেতাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সফরটিকে তিনি ‘স্বপ্নের মতো সফর’ হিসেবে অভিহিত করেন।
আরও পড়ুন: লিবিয়ার বন্দিশালা থেকে দেশে ফিরছেন ১৭২ বাংলাদেশি
কাজী সারওয়ার হাবিব বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। এসব সম্ভাবনা বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নিতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
তবে, বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, জাপানি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন। তাই, তাদের আস্থা অর্জনে সহজ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, স্থিতিশীল নীতিকাঠামো এবং দ্রুত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কাজী সারওয়ার হাবিব। তিনি বলেন, দুই দেশের উদ্যোক্তা, ক্রেতা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়মিত যাতায়াতের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা থাকলে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বিনিয়োগের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি জানান, জাপানের শীর্ষস্থানীয় পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও মুজির পক্ষ থেকেও জাপানি ও বাংলাদেশি কর্মীদের অনুপাত এবং ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে তিনি অবগত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে এই প্রথম, এসসিও’র বৈঠকে পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ ভারত
কাজী সারওয়ার হাবিবের মতে, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এরপর দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গেলে জাপানি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো সহজ হবে।
জাপানে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ভাষাগত দক্ষতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন কাজী সারওয়ার হাবিব। তার মতে, জাপানি ভাষা জানা থাকলে বাংলাদেশি তরুণদের জন্য দেশটিতে কাজের সুযোগ বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে থেকেই এক থেকে দেড় বছর জাপানি ভাষা শেখার চেষ্টা করলে এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে তরুণদের জন্য জাপানে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জাপানি ভাষার এন-২ পর্যায়ের দক্ষতা থাকলে বিভিন্ন পেশায় এগিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে।
কাজী সারওয়ার হাবিব বলেন, জাপানি ভাষায় দক্ষ তরুণেরা বাংলাদেশে থেকেও মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরি পেতে পারেন। তবে, বেতন ও চাকরির সুযোগ কাজের ধরন, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিয়োগদাতার শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
আরও পড়ুন: ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন করে ভারত তাদের বন্ধুত্ব প্রমাণ করবে: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাপানি ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
উচ্চশিক্ষার জন্যও জাপান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হতে পারে বলে মনে করেন কাজী সারওয়ার হাবিব। তিনি বলেন, দেশটিতে বিভিন্ন ধরনের বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী বৃত্তি পেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা সহজ হতে পারে।
তার মতে, জাপানে পড়াশোনার পাশাপাশি ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবেন। এতে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
কাজী সারওয়ার হাবিব দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। তিনি মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যিক লেনদেনে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করতে হবে।
আরও পড়ুন: আড়াইহাজারে পরিবেশদূষণের দায়ে প্রবাসী হাসপাতালকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানো এবং জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইপিএর সুবিধা ব্যবহার, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, ক্রেতাদের আস্থা অর্জন, ভিসা জটিলতা নিরসন এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কাজী সারওয়ার হাবিব বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাত সমন্বিতভাবে কাজ করলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ আরো বিস্তৃত হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদার হলে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের পথও সুগম হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন