১২:০৬ পি.এম
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশনের (ইন্টারপোল) রেড নোটিশভুক্ত নজরুল ইসলাম মোল্লা, যিনি একজন বাংলাদেশি নাগরিক, গ্রেফতার হয়েছেন লিবিয়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। গ্রেফতার হওয়া এই ব্যক্তি বর্তমানে লিবিয়ার কারাগারে বন্দী অবস্থায় আছেন। গ্রেফতারের ঘটনাটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম মোল্লার বিরুদ্ধে মানব পাচার, মুক্তিপণ গ্রহণ এবং হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২০ সালের মে মাসে লিবিয়ার মিজদাহতে মানব পাচারকারীদের গুলিতে ২৬ জন বাংলাদেশি নিহত হন। ওই ঘটনায় বাংলাদেশে দায়ের করা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি নজরুল মুক্তিপণ আদায়ে জড়িত থাকার অভিযোগে দীর্ঘদিন বিদেশে পালিয়ে ছিলেন। এই গ্রেফতার হওয়ার পর এখন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার পুলিশের একাধিক সূত্রের মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়।
একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ছয়জন প্রধান মানব পাচারকারীদের শনাক্ত করে এবং তাদের ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছিল। তাদের মধ্যে নজরুল ইসলাম অন্যতম। অন্য পাঁচ জন হচ্ছেন মিন্টু মিয়া, স্বপন, তানজিরুল, জাফর ইকবাল এবং শাহাদত হোসেন। পাঁচ বছর পর, অবশেষে নজরুলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা।
আরও পড়ুন: টুঙ্গিপাড়ার ইউএনও’র মাদকবিরোধী আহ্বান, সুন্দর জীবন গড়ার পরামর্শ
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (সিরিয়াস ক্রাইম) বদরুল আলম মোল্লা বলেছেন, 'লিবিয়ায় নজরুলের গ্রেফতারের খবর আমাদের জানানো হয়েছে। তাঁকে দেশে আনলে মানব পাচারের সাথে সম্পর্কিত অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে।'
গতকাল ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে নজরুলের তথ্য দেখে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশের মাদারীপুরের বাসিন্দা। সেখানে নজরুলের একটি ছবি উল্লেখ রয়েছে। তিনি ১৯৭৭ সালের ৪ মে জন্মগ্রহণ করেন। অভিযোগের বিষয়ে ইন্টারপোল জানিয়েছে, তিনি অবৈধ লাভের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধভাবে আটক রেখে জিম্মি করা এবং মুক্তিপণ চেয়েও হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন।
গতকাল পর্যন্ত ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে রেড নোটিশভুক্ত বাংলাদেশির সংখ্যা ৫৯ জন। সেখানে নজরুল ইসলাম ছাড়া আরও তিনজন মানব পাচাকারীর তথ্য রয়েছে, যাদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের মিন্টু মিয়া, তানজিরুল এবং স্বপন।
এছাড়া সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ দলের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ২০১৯ সালে ইন্টারপোল রেড নোটিশভুক্ত দুই বাংলাদেশি মানব পাচারকারীও গ্রেফতার হয়েছিল। তাদের একজন কিশোরগঞ্জের জাফর ইকবাল, যিনি ইতালি থেকে আটক হয়েছিলেন, এবং অপরজন মাদারীপুরের শাহাদত হোসেন, যিনি ঢাকায় গ্রেফতার হন।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে রেশম শিল্পের উন্নয়নে বিশেষ কমিটি গঠন
জানা যায়, ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার প্রেক্ষিতে মিজদাহতে, মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতন নিয়ে সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন এবং বনানী থানায় তিনটি মামলা করেছে। এর বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ২৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব案件ের আসামি সংখ্যা ২৯৯ জন।
সিআইডির তথ্যানুসারে, মানব পাচারের মামলা বাড়ছে। ২০২৫ সালে ১২২টি, ২০২৪ সালে ১০০, ২০২৩ সালে ৮৬ এবং ২০২২ সালে ১১৪টি মামলা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ টিমের পক্ষ থেকে ৩৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, অনেক বাংলাদেশি তরুণ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পার করে ইতালি যেতে চাচ্ছেন, তবে তারা দালালদের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন। তাঁদের অধিকাংশই নৌকায় যাওয়ার সময় মারা যাচ্ছেন। অনেক টাকা আদায় করার পর দালালরা তাদেরকে লিবিয়া থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে একটি কাঠের নৌকায় তুলে দেয় এবং তারপরে দায় সারে। এই ধরনের কার্যক্রমকে 'গেমিং' বলা হয়।
লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে মিজদাহে ৬ বছর আগে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছিল। এই ঘটনায় আহত হন আরও ১২ জন। সিআইডির অনুরোধে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ইন্টারপোলকে রেড নোটিশ জারির সুপারিশ করেছিল। এখন পর্যন্ত তিনজন রেড নোটিশভুক্ত আসামীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। বাকিদের অবস্থান এবং গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের সময় আটক সার্ভেয়ার আসাদুল ইসলাম
বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুলিশ জানিয়েছে, মাদারীপুরের মানব পাচারকারী দলের অন্যতম প্রধান সদস্য হলো নজরুল ইসলাম মোল্লা, জাফর এবং শাহাদত। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশে চাকরির নিশ্চয়তার নাম করে প্রতারণা, মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি করা এবং হত্যা সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১ জুন লিবিয়া থেকে ১৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফেরত ফিরে আসেন। লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লিবিয়া সরকার এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ সম্পন্ন হয়।
প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপ গমনের উদ্দেশ্যে মানব পাচারকারীদের ছলনায় এবং সহযোগিতায় লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন। তাদের অনেকেই লিবিয়ায় বিভিন্ন সময় অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
লিবিয়ায় বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা একসাথে কাজ করে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বঙ্গভবনে
সূত্র: সমকাল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন