১১:৫০ এম
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে চীনের বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে দেশীয় সম্ভাবনা তুলে ধরার জন্য ছয়টি বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। ইউনানে বিনামূল্যে ২,০০০ বর্গমিটারের প্রদর্শনী স্টলসহ এই সুবিধাগুলো দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা হলেও কমিয়ে আনবে বলে ব্যবসায়ী নেতাদের বিশ্বাস। একইসঙ্গে, উদ্যোগটি অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে আশা করছেন দেশি উদ্যোক্তারা।
জানা গেছে, ‘থ্রি ফ্রি’ ও ‘থ্রি ফেসিলিটেশন’—এই দুই নীতিমালার আওতায় চীনে ছয়টি বাণিজ্য সুবিধা পাবেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। সম্প্রতি চীনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব সুবিধার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সরকারের অংশ হিসেবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সঙ্গে কাজ করছে চীন।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র আমার দেশকে জানায়, চীনের ‘থ্রি ফ্রি’ নীতির আওতায় বিনামূল্যে ইউনান প্রদেশে ২,০০০ বর্গমিটার ওয়্যারহাউস সুবিধা পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর ফলে এক দিনে যেমন চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য সরবরাহ দ্রুত হবে, তেমনি দেশের উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে বিনামূল্যে ২,০০০ বর্গমিটারের অফলাইন প্রদর্শনী হল দেবে চীন। এটি দেশের বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্যের সুযোগ ও ক্রয়াদেশ বাড়াতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে দেশের উন্নয়ন অর্জন, সম্পদের সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে আরো বেশি মানুষ জানার সুযোগ পাবে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমনকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠাল আদালত
এ ছাড়া চীনের অনলাইন কমোডিটি মলে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ। এই অনলাইন কমোডিটি মলে যুক্ত হয়ে এবং সমন্বিত বিপণন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন পণ্য বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে নতুন বাজারের সুযোগ তৈরির বিষয়টি আরো সহজ হয়ে ওঠার পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে উঠবে এবং দেশের পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব আরো বাড়বে বলে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন।
অন্যদিকে ‘থ্রি ফেসিলিটেশন’ নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি সহজ করতে তিন বিশেষ লজিস্টিক সহায়তা পাবে বাংলাদেশ। এর আওতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীনের বাজারে প্রবেশ সহজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট লজিস্টিকস ও পরিবহন ফি মওকুফের সুবিধা পাবেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের শাকসবজি, ফলমূলসহ পচনশীল কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য দ্রুত চীনের বাজারে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কাস্টমস ছাড় ও দ্রুত ক্লিয়ারেন্সের সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এর ফলে দেশের কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী তাদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ পাবে।
‘থ্রি ফেসিলিটেশনের’ একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—অংশীদার দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মালবাহী ট্রেন ‘লানছাং-মেকং এক্সপ্রেস+’-এর মাধ্যমে পরিবহনে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেওয়া। এর ফলে একদিকে যেমন বাণিজ্য প্রক্রিয়ার প্রতিবন্ধকতা কার্যকরভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা আরো সহজ ও সুশৃঙ্খল হবে; অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার সামগ্রিক দক্ষতা বেড়ে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর লজিস্টিকস ব্যয় কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মতো বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের এমন শুল্কমুক্ত ও সহজ প্রবেশাধিকার দেশের রপ্তানি ঝুড়িকে বহুমুখী করার বড় একটি সুযোগ। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন আমার দেশকে বলেন, এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নিলে দেশের তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য ও হস্তশিল্পের রপ্তানি বহুগুণ বাড়বে। একইসঙ্গে এই যুগান্তকারী লজিস্টিক ও নীতিগত সহায়তা কার্যকর হলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি পর্যায়ক্রমে একটি টেকসই ও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।
আরও পড়ুন: ২০২৭ সালের মধ্যে নিরাপদ সড়ক আইন কার্যকর হবে: সড়কমন্ত্রী
এর আগে গত বছরের অক্টোবরে দায়িত্ব গ্রহণের পর চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম। সেখানে দেশের ব্যবসায়িক উন্নয়নের জন্য ছয়টি দাবি তুলে ধরে বিসিসিসিআই। এর মধ্যে ছিল দীর্ঘদিনের দাবির অন্যতম বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের শাখা খোলা, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে ম্যানমেইড ফাইবারের (এমএমএফ) কারখানা স্থাপন করা, পুঁজিবাজারে চীনের বিনিয়োগ, ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ, চীনে রপ্তানি বাড়াতে তাদের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনীর জন্য বিনামূল্যে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও গুদাম স্থাপন করে দেওয়া এবং চীনের উদ্যোগে বাংলাদেশে ২০টি পলিটেকনিক স্কুল করে এখানকার ছেলেমেয়েদের হাতে-কলমে প্রযুক্তি শিক্ষা দেওয়া। তবে সম্প্রতি চীনের এমন সুবিধার ঘোষণা দেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে বলে মনে করেন দেশি উদ্যোক্তারা।
এ বিষয়ে বিসিসিসিআই সভাপতি ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খোরশেদ আলম আমার দেশকে বলেন, আমরা গত বছরের অক্টোবরে ছয়টি প্রস্তাব বা দাবি জানিয়েছিলাম চীনের কাছে। সম্প্রতি এসব উদ্যোগ নিয়ে কাজ এগিয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানি সহজীকরণ, প্রদর্শনী ও পণ্য উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি এবং পলিটেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়ও রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইপিবি কাজ করছে। চুক্তির বিষয়গুলো মূলত সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে সম্পাদিত হয়। আমার জানামতে, ইপিবি ও চীন সরকারের মধ্যেও এ-সংক্রান্ত আলোচনা অনেকটা এগিয়েছে।
বিসিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘আমরা মনে করি বিনা ভাড়ায় এ জায়গা পাওয়া গেলে বাংলাদেশের জন্য তা বড় একটি সুযোগ হবে। সেখানে বাংলাদেশি ও চীনা কর্মী রেখে পণ্য প্রদর্শন, বিক্রি এবং বাজারের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কোন কোন পণ্য নিয়ে চীনের বাজারে আরো বড় পরিসরে প্রবেশ করা যায়—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও এটি সহায়ক হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য এ উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং বছরে অন্তত এক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি করা। তবে সেটি বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত পণ্য নির্বাচন, বাজার যাচাই এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বি১/বি২ ভিসায় নতুন নির্দেশনা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন