০৪:২৯ পি.এম
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন চলছে পাট কাটার মৌসুম। এই মৌসুমে ভালো ফলন, ন্যায্য দাম এবং পাটের বহুমুখী পণ্য ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে পাট খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। এর সাথে নাটোর জেলায় পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়ে চলেছে। ফলে জেলায় সোনালী আঁশের দিন আবার ফিরে আসছে।
বিগত সময়ে পাটের উচ্চ মূল্যের কারণে কৃষকরা ক্রমশ পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। নাটোর জেলায় পাট চাষের জন্য আবাদের জমি এবং উৎপাদনের পরিমাণ উভয়ই বেড়েছে। জমিতে সবুজে ভরপুর পাটরাজ্যে এখন চলছে পাট কাটার কাজ।
অন্য দিকে, জলাশয় এবং তার পাড়ে পাট গাছ ভেজানো, পাটের আঁশ ছড়ানো, পাট শুকানো এবং পাটকাঠি সংগ্রহের সকল কার্যক্রম একযোগে চলছে। সবুজ পাট গাছ এখন রূপান্তরিত হচ্ছে সাদা পাটে এবং পাটকাঠিতে। রূপালী রৌদ্র মেঘে ঢেকে গিয়ে প্রকৃতিতে নামছে শ্রাবণ ধারা। গ্রামীণ জনপদে কৃষকদের জন্য প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করে এখন পাট উৎসব চলছে।
আরও পড়ুন: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে খড়বোঝাই গাড়িতে অগ্নিকাণ্ড
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, এই বছর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের আবাদ হয়েছে। ৩০ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমির বিপরীতে ৩৫ হাজার ৬৬ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। বিগত এক যুগ আগে জেলায় পাটের আবাদের জমি চলতি বছরের প্রায় অর্ধেক ছিল। পাটের আবাদের জমি বিগত সময়ে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে আবাদের জমি এবং হেক্টর প্রতি পাটের গড় উৎপাদন উভয়ই বেড়েছে। ইতোমধ্যে ১৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির পাট কাটা হয়েছে। মোট উৎপাদনের পরিমাণ ৩০ হাজার ৯৯০ টন।
সিংড়া উপজেলার সাঁঐল এবং লাড়ুয়া গ্রামের কয়েক কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশ এবং সংলগ্ন বিল ও ডোবাতে শতাধিক নারী ও পুরুষ পাট পঁচানো এবং আঁশ ছড়ানোর কাজে নিয়োজিত আছেন। এই কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তারা মূলতঃ পানিতে না নেমেই জলাশয়ের পাড়ে তোলা পঁচানো পাটের আঁশ ছড়াচ্ছেন।
আঁশ ছড়ানোর কাজে নিয়োজিত ভানু বেওয়া বলেন, “আমি পাট কাঠি নেয়ার শর্তে আঁশ ছড়ানোর কাজ করছি।” হাতিয়ানদহের গদাই নদীতে নেমে আঁশ ছড়ানোর কাজ করায় হারেস মিয়া জানান, “আমরা ১০জন কাজ করছি। প্রতিদিন জনপ্রতি ৭০০ টাকা মজুরি।” আবার অনেকেই আটি প্রতি সাড়ে চার টাকা দরে কাজ করছেন।
নদীর পাড়ে আঁশ ছড়ানোর কাজে আরও ১০ জন মহিলা কাজ করেন। মিনতি রানী জানান, “আমরা সবাই পাটকাঠি নেয়ার শর্তেই কাজ করছি।” আবার অনেক কৃষকের পরিবারের নারী সদস্যরাও তাদের নদী সংলগ্ন বাড়ির আঙিণায় পাটের আঁশ ছড়াচ্ছেন।
আরও পড়ুন: নরসিংদীতে কারখানায় আগুন, ৫ জন দগ্ধ বার্ন ইউনিটে
মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী হাফসা বলেন, “স্কুল ছুটির দিন, তাই বাড়ির সবাই মিলে পাটের আঁশ ছড়াচ্ছি। নিজের বাড়ির কাজ নিজেরাই করছি।”
রাস্তার দু’ধারে বাঁশের আড় টানিয়ে, কালভার্টের রেলিং এবং গৃহস্থ বাড়ির চারপাশে সর্বত্রই চলছে পাট শুকানোর কার্যক্রম। এসব এলাকায় ঠায় দাঁড়িয়ে পাটকাঠির বোঝা সমৃদ্ধির দিশা দিচ্ছে।
লাড়ুয়া এলাকার কৃষক রমিজুল জানিয়েছেন, এবার তিনি তার দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। লাড়ুয়া বিলে পাট ছড়ানোর শ্রমিকদের কাজ তদারককারী রমিজুল বলেন, “এবার আষাঢ়-শ্রাবনে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। হাতের নাগালে আশপাশের সকল জলাধার পানিতে টইটুম্বুর থাকায় জমির পাট অনায়াসে পঁচাতে পারছি, পরিবহনের খরচ নেই। তবে বৃষ্টি বেশি, রোদ কম হওয়াতে পাট শুকানোর কাজে কষ্ট হচ্ছে।” অনেক সময় শুকাতে দেওয়া পাট আবার বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে।
নাটোর সদর উপজেলার হয়বতপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, “এবার এলাকায় আশানুরূপ পাট চাষ হয়েছে। গড় উৎপাদন বিঘা প্রতি ৯ মণ।”
আরও পড়ুন: খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে একই স্থানে ২ দুর্ঘটনায় ৫ প্রাণহানি
রাজাপুর কৃষি ব্লকের জাঠিয়ান এলাকার কৃষক জুবায়ের হোসেন জানিয়েছেন, “এবার সাত বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। পাট কাটা শুরু হয়েছে। আশা করি বিঘায় ১০ মণ ফলন পাবো।”
নলডাঙ্গা উপজেলার বাঁশিলা গ্রামের কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেছেন, “জমিতে গম বা ডাল উঠে যাওয়ার পর আমন মৌসুমের আগে পাট চাষ করা হলে জমি অনাবাদি থাকে না। চৈত্র মাসের মধ্যে পাট বীজ বোনা হলে আগাম পাট কেটে সহজেই আমন মৌসুম ধরা যায়।”
নাটোরের আদর্শ কৃষক হাসান আলী বলেন, “গত কয়েক বছরে কৃষকদের মধ্যে পাট চাষে বেশ ভাল আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “পাট বাজারের সম্প্রসারণ ঘটছে। ফলে দামও ভাল পাওয়া যাচ্ছে।”
আরও পড়ুন: মহাখালীতে ট্রেনের ধাক্কায় যুবক মো. রায়হান নিহত
সরেজমিনে নাটোরের প্রসিদ্ধ পাটের হাট গুরুদাসপুরের নাজিরপুর, নাটোর সদরের তেবাড়িয়া এবং সিংড়ার হাতিয়ান্দহ হাট ঘুরে দেখা গেছে, আগাম ওঠা পাট হাটে কেনাবেচা শুরু হয়েছে।
হাতিয়ান্দহ হাটে পাট বিক্রি করতে আসা ফিরোজ আলী বলেন, “হাটে সাড়ে ৩ হাজার টাকা মণ দরে জমির পাট বিক্রি করলাম।”
দীর্ঘদিন ধরে পাট ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম মেম্বর একটি মন্তব্য করে জানান, “আশাকরি পাটের দাম ব্যবসায়ী ও কৃষক উভয়ের জন্যই ভাল হবে। বর্তমানে পাটের দর ৩ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। সামনে আরো দাম বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। এবার পাটের বিপণন কার্যক্রম জমজমাট।”
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ হাসান জানিয়েছেন, “আমাদের উপজেলায় বর্তমানে পাটের গড় উৎপাদন বিঘা প্রতি সাড়ে সাড়ে ৮ মণ। তবে গড় উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।”
আরও পড়ুন: মহেশপুর সীমান্তে ভারতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা, নারীসহ আটক ১২
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বাসস’কে বলেন, “চলতি মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টির কারণে পাট জাগ দেয়ার জন্য সহায়ক হয়েছে। পরিবেশ বান্ধব বলেই পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দেশে এবং বিদেশে পাটের চাহিদা বাড়ছে।”
তিনি আরো বলেন, “বাড়তি মূল্য পাওয়ার কারণে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন এবং পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তাদেরকে প্রণোদনাও প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি জ্ঞানে কৃষকদের এগিয়ে নিতে কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের পাশে থাকছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন