০৬:৪৮ পি.এম
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে জব্দকৃত চোরাচালানের কম্বল সংখ্যা কম দেখিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া তিনি কম্বলগুলোর গুণগত মান গোপন করেছেন এবং আসামিদের সুবিধার্থে তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে আদালতে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করিয়েছেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা শাস্তির মুখে পড়লেও ওসি মনির ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
একাধিক মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ, এসএমপি কমিশনারের চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, কম্বল আত্মসাতের ঘটনায় এসএমপি কমিশনার মোগলাবাজার থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেনকে কৈফিয়ত তলব (শোকজ) করে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠিতে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বক্তব্য, চুরির সময়ের ছবি এবং বিভিন্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর সত্যতা মিলেছে।
কমিশনারের চিঠি অনুযায়ী, মোগলাবাজার থানার একটি চোরাচালানবিরোধী অভিযানে (মামলা নং: জিআর-০৫/২৬) একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে ৫৬০ পিস দ্বিস্তরবিশিষ্ট (ডাবল পার্ট) ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়। কিন্তু মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেনের নির্দেশে মামলার মূল এজাহারকারী এক উপপরিদর্শক (এসআই) প্রকৃত সংখ্যা ও গুণগত মান গোপন করেন। তিনি জব্দতালিকায় ৫৬০ পিসের বদলে এজাহারে মাত্র ৪৩০ পিস কম্বল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কম্বলগুলো সিঙ্গেল পার্ট নাকি ডাবল পার্ট, তা জব্দতালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
আরও পড়ুন: মন্দিরে অর্থ সহায়তা করলেন আলিনগর ইউপি নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী কাওসার হাওলাদার
পরে দেখা যায়, সিলেট শাহপরান থানার অপর একটি মামলায় (জিআর-২৬৫/২৫) মো. কামরুল হাসান নামের এক ব্যক্তি আদালত থেকে নিলামে ৬৫৮ পিস এক স্তরবিশিষ্ট (সিঙ্গেল পার্ট) পাতলা কম্বল কিনেছেন। তারপর তার কাছ থেকে দুই ব্যবসায়ী আরমান হুদা ২২৮ পিস এবং মো. সেলিম আহমদ ৪৩০ পিস কম্বল কিনে নেন। এরপর আসামি ও চোরাকারবারিদের সুবিধা পাইয়ে দিতে মোগলাবাজার থানার পুলিশ কর্মকর্তারা নতুন নাটক সাজান। মো. সেলিম আহমদ আদালতে আবেদন করেন যে, মোগলাবাজার থানায় আটক ৪৩০ পিস কম্বল শাহপরান থানার মামলার কেনা নিলামের কম্বল। ওসি মনিরের পরিকল্পনা ছিল, আদালতের মাধ্যমে কম্বলগুলো সেলিম আহমদের জিম্মায় দিয়ে দামি ডাবল পার্টের কম্বলগুলো নামমাত্র মূল্যে বের করে নিয়ে যাওয়া এবং এজাহারে গোপন রাখা অতিরিক্ত ১৩০ পিস কম্বল নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া।
এই মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পান পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেন। আদালত আলামতের প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের নির্দেশ দিলে কাজী তোবারক হোসেন সরেজমিনে থানায় রক্ষিত কাভার্ড ভ্যানের কম্বল গণনা বা পরীক্ষা না করেই চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আদালতে একটি মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেন। তার প্রতিবেদনে বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ায় আদালত নতুন করে কম্বল গণনা ও গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটি মোগলাবাজার থানার কম্পাউন্ডে তল্লাশি চালিয়ে ৫৬০ পিস দামি দ্বিস্তরবিশিষ্ট কম্বল পায়। পরে কমিটি আদালতকে অবহিত করে।
গত ৯ মার্চ আদালত তোবারক হোসেনকে সশরীরে হাজির হতে বলা হয় এবং কৈফিয়ত দিতে বলেন। শুনানি চলাকালীন তিনি জনৈক ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন বলে জানান এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু আদালত তার অপেশাদার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা নামঞ্জুর করে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়ে এসএমপি কমিশনার বরাবর চিঠি পাঠান। এসএমপি পরে তাকে কৈফিয়ত তলবনামা পাঠায় এবং তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থি, অপেশাদারিত্ব, অদক্ষতা, নৈতিক স্খলন, গাফিলতি অভিযোগ তুলে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানানো হয়।
কিন্তু এসব ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত নায়ক, ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গা পৌরসভার ১১ পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও আর্থিক সহায়তা দিলেন মেয়র পদপ্রার্থী আব্দুল মান্নান মিয়া আব্বাস
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেন বলেছেন, কোনো কম্বল চুরি হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা গণনায় ভুল করেছেন। সকল কম্বল থানার হেফাজতে ছিল এবং পরে তা আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
এসএমপি কমিশনারের একটি চিঠিতে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওসির মদদে ও নির্দেশে কম্বল চুরি হয়েছে। কমিশনার কেন এভাবে লিখেছেন, এমন প্রশ্নে ওসি মনির মন্তব্য করেন, কেউ কারো বিরুদ্ধে লিখলে তো আর কম লিখে না। ফলে তিনি এভাবে লিখেছেন।
এ ব্যাপারে এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. এনামুল হক বলেন, আমি ওসি মনিরের সঙ্গে আলোচনা করব। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে পুঙ্খানাপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয়। তদন্তে প্রমাণ পেলে প্রথমে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং পরে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আরও পড়ুন: ফেনীতে মাদক কারবারিদের হামলায় আহত দিনমজুর মোহাম্মদ হানিফের মৃত্যু
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন